জাহাজ ভাঙা শিল্প: অর্থনীতি, মানবিক দায়বদ্ধতা ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের সন্ধানে

দেলোয়ার জাহিদ ||

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম হংকং কনভেনশনসম্মত গ্রিন শিপইয়ার্ড PHP Ship Breaking and Recycling Industries পরিদর্শনকালে ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত Dr. Rüdiger Lotz বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এ শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। একই সঙ্গে তিনি শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

জার্মান রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় না; এটি আমাদের সামনে এক গভীর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। শৈশবে রুশ সাহিত্যিক Maxim Gorky-এর আত্মজীবনী ও সাহিত্যকর্ম আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। গোর্কির লেখায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুঃখ, বঞ্চনা এবং স্বপ্নের যে মানবিক উপস্থাপন দেখা যায়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি মানুষের বাস্তব জীবন থেকে উৎসারিত হয়। তাই সমাজের অবহেলিত ও পরিশ্রমী মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা শুধু সাহিত্যিক দায়িত্ব নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতারও অংশ। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জীবন, ঝুঁকি, সংগ্রাম এবং স্বপ্নও সেই বৃহত্তর মানবিক বাস্তবতারই অংশ।

জাহাজ ভাঙা শিল্প, বা শিপ রিসাইক্লিং শিল্প, বৈশ্বিক সামুদ্রিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। পুরোনো ও অকেজো জাহাজ ভেঙে ইস্পাত, যন্ত্রপাতি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমে এই শিল্প বিশ্বব্যাপী নির্মাণ ও উৎপাদন খাতকে সহায়তা করে। প্রাচীনকাল থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ পুনর্ব্যবহারের প্রথা থাকলেও আধুনিক শিল্পভিত্তিক জাহাজ ভাঙার সূচনা ঘটে উনবিংশ শতকের শেষভাগে, যখন ইস্পাতনির্ভর জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ঘটে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো এই শিল্পে নেতৃত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিপুল সংখ্যক সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ ভেঙে পুনর্গঠন ও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ইস্পাত সংগ্রহ করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে উচ্চ শ্রম ব্যয়, কঠোর পরিবেশ আইন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সস্তা শ্রমশক্তির কারণে জাহাজ ভাঙার শিল্প ধীরে ধীরে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে; পরে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এই শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দীর্ঘ উপকূলরেখা, কম পরিচালন ব্যয় এবং স্ক্র্যাপ ইস্পাতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এই দেশগুলোকে বৈশ্বিক শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে শক্তিশালী অবস্থান এনে দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯৬০-এর দশকে একটি গ্রিক জাহাজ ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়েই এ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এই শিল্প দেশের ইস্পাত চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করছে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। ভারতের আলাং এবং পাকিস্তানের গাদানি শিপইয়ার্ডও বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। তবে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই শিল্প দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য এবং শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে সমালোচিত হয়েছে। পুরোনো জাহাজে থাকা অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ শ্রমিক ও উপকূলীয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

এই প্রেক্ষাপটে International Maritime Organization ২০০৯ সালে হংকং কনভেনশন প্রণয়ন করে, যার লক্ষ্য নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা। বর্তমানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, গ্রিন শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। PHP Ship Breaking and Recycling Industries-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিবেশসম্মত অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে শিল্পটি এখন ধীরে ধীরে টেকসই উন্নয়ন ও মানবিক দায়বদ্ধতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী পুরোনো জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি, পুনর্ব্যবহারের চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কারণে ভবিষ্যতে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং পরিবেশ-নিয়ন্ত্রিত ড্রাই-ডক পদ্ধতির ব্যবহার এই শিল্পকে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করে তুলতে পারে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পাশাপাশি শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য, ন্যায্য মজুরি এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, কোনো শিল্পের প্রকৃত সাফল্য শুধু মুনাফায় নয়, মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন