ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘গোপন সফর’ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর কার্যালয় বলেছে, এই বৈঠক ছিল ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই এই দাবি অস্বীকার করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এমন সফরের খবর ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’।
আমিরাত আরো বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোনো গোপন বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নয়, বরং প্রকাশ্যে ঘোষিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা হয়েছিল।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই আমিরাতের সমালোচনা করে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, নেতানিয়াহু এমন তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই দেশটির নেতাদের জানিয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে এ ধরনের গোপন সহযোগিতা ‘ক্ষমার অযোগ্য’ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের ‘জবাবদিহি করতে হবে’। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হওয়া কিছু চুক্তি।
এসব চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
রয়টার্স এক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের বৈঠকটি ওমান সীমান্তের কাছের মরূদ্যান শহর আল-আইনে হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা ধরে এই বৈঠক চলে।
মঙ্গলবার ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, ইরানি হামলা মোকাবিলায় আমিরাতকে সহায়তা করতে ইসরায়েল তাদের আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যাটারি পাঠিয়েছে। আয়রন ডোম হলো ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়।
হাকাবি জানিয়েছেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির ওপর ভিত্তি করে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের অসাধারণ সম্পর্কের ফলে আয়রন ডোম গড়ে উঠেছিল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ সেই সম্পর্ককে আরো গভীর করেছে বলে মনে হচ্ছে এবং এই জোটটিকে সামরিকভাবেও শক্তিশালী করেছে।
যুদ্ধ চলার সময় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ১০ মে আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ইরান থেকে ছোড়া দুটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে আমিরাত দাবি করেছে, তারা এখন পর্যন্ত ৫৫১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২৬৫টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে, যদিও তারা এখনো তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। এর মধ্যে এপ্রিলের শুরুতে ইরানের লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগারে হামলাও ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
বুধবার আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, কূটনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী হলেও আত্মরক্ষার অধিকার আমিরাতের রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আমিরাত এই যুদ্ধ চায়নি এবং এটি এড়াতে চেষ্টা করেছে।
তিনি আরো বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে আরব-ইরান সম্পর্ক সংঘাত ও বিরোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না।’ প্রায় এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, যাতে তারা মার্কিন শর্ত মেনে নেয়। রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো পাল্টা প্রস্তাবে ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানায়।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আরো বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি খুবই সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনী “যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে এবং উপযুক্ত শিক্ষা দিতে প্রস্তুত।’
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন