কাজল রশীদ ||
স্বাধীনতার দীর্ঘ পথচলায় আমরা কি সত্যিই আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছি,এই প্রশ্নটি আজ শুধু প্রশ্ন নয়, এটি এক অস্বস্তিকর সত্যের দরজা। ইতিহাসের পাতায় রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে, কিন্তু সেই রক্তের ঋণ এখনো বাতাসে ঝুলে আছে। স্বাধীনতা কোনো একদিনের উল্লাস নয়,এটি এক জ্বলন্ত চেতনা, এক অবিরাম দায়বদ্ধতা, এক প্রতিজ্ঞা, যা প্রতিদিন আমাদের কাজে, আমাদের বিবেকে প্রমাণ করতে হয়। একদিন এই মাটিতে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তির,শৃঙ্খল ভাঙার, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্নের জন্য বিসর্জন গিয়েছে অসংখ্য প্রাণ, অশ্রুতে ভিজেছে মায়ের আঁচল, রক্তে রাঙা হয়েছে পথঘাট। স্বাধীনতার সূর্য উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু তার আলো কি সত্যিই পৌঁছেছে প্রতিটি হৃদয়ে, প্রতিটি ঘরে? আজ আমরা এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যেখানে ইতিহাস নিয়ে গর্ব করার কথা, সেখানে আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছি ইতিহাসকে নিজের মতো করে গড়তে, বিকৃত করতে, বিভক্ত করতে। সত্যকে আড়াল করে মিথ্যার আবরণে ঢেকে দিতে চাইছি অতীতকে। যেন ইতিহাস কোনো আয়না নয়,এটি হয়ে উঠেছে এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে সত্য আর স্বার্থ প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে লিপ্ত।
এই প্রবণতা নিঃশব্দে আমাদের ভেতরকে ক্ষয় করছে। বিভাজনের বিষবৃক্ষ শিকড় গেঁড়ে বসছে সমাজে, চেতনায়, সম্পর্কের ভেতরে। আমরা ভুলে যাচ্ছি,স্বাধীনতার প্রকৃত শক্তি ঐক্যে, সহমর্মিতায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধায়। বিভক্তির পথে হাঁটলে স্বাধীনতা শুধু একটি শব্দ হয়ে যায়,তার আত্মা নিঃশেষ হয়ে যায়। আমরা কি একবারও ভেবেছি,যে ইতিহাসকে আমরা আজ বিকৃত করছি, সেটিই আগামী প্রজন্মের কাছে সত্য হয়ে দাঁড়াবে? তারা কি জানবে আত্মত্যাগের মহিমা, নাকি তারা শিখবে বিভ্রান্তির গল্প? ইতিহাস বিকৃতি মানে শুধু অতীতকে নয়,এটি ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার এক বিপজ্জনক খেলা। অথচ আমাদের দায়িত্ব ছিল ভিন্ন। ইতিহাসকে বুকে ধারণ করা, তার থেকে শিক্ষা নেওয়া, তার আলোয় নিজেদের পথ তৈরি করা। গর্ব মানে অন্ধ অনুসরণ নয়,গর্ব মানে সত্যকে গ্রহণ করা, ভুলকে স্বীকার করা, এবং আরও ভালো হওয়ার সাহস রাখা। এই বিভাজন থেকে মুক্তি এখন শুধু প্রয়োজন নয়,এটি জরুরি, এটি অপরিহার্য। আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মূল চেতনায়, যেখানে মানুষ মানুষকে আপন করে নেয়, যেখানে মতের ভিন্নতা বিভেদ নয়, বরং সৌন্দর্য। আমাদের শিখতে হবে একসাথে চলা, একসাথে ভাবা, একসাথে গড়া। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার জন্য সমান হয়,চিন্তায়, কথায়, কাজে। ইতিহাস তখনই বেঁচে থাকে, যখন তা সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর আমরা তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হই, যখন আমাদের মন মুক্ত থাকে সংকীর্ণতা আর বিভাজনের বেড়াজাল থেকে। আসুন, আমরা ইতিহাসকে বিকৃত না করে তাকে আলিঙ্গন করি। বিভাজনের দেয়াল ভেঙে ঐক্যের সেতু গড়ে তুলি। কারণ, স্বাধীনতার প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে আমাদের সম্মিলিত চেষ্টায়, আমাদের মানবিকতায়, আমাদের সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়। হয়তো তখনই আমরা গর্ব করে বলতে পারব,আমরা শুধু স্বাধীন হইনি, আমরা স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে শিখেছি।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন