দেলোয়ার জাহিদ ||
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি অস্থির ও তাৎপর্যপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সরকার পরিবর্তন, গণঅভ্যুত্থান, রাস্তায় ছাত্র-জনতার শক্তির উত্থান এবং প্রশাসনিক কাঠামোর দ্রুত পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এর মধ্যে বিচারব্যবস্থা ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও চাপের মুখে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। বিশেষত “মব” বা সংগঠিত চাপের প্রভাব বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক ভারসাম্য এবং আইনের শাসন নিয়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।
“মব” ও বিচারব্যবস্থা: নতুন এক বাস্তবতার উত্থান “মব” বলতে সাধারণত এমন এক আবেগপ্রবণ বা সংগঠিত একটি জনসমষ্টিকে বোঝায়, যারা প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে সিদ্ধান্ত আদায়ের চেষ্টা করে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পায়। আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ, বিচারকদের বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের উপর ঘেরাওধর্মী চাপ—এসব ঘটনা বিচারব্যবস্থাকে এক নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করায়। ফলে বিচারব্যবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রেই আর সম্পূর্ণ স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়নি; বা দেখার সুযোগ ছিলোনা বরং এটি রাজনৈতিক আবহ, জনমত ও রাস্তাঘাটের চাপের প্রতি সংবেদনশীল এক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে—এমন ধারণা ক্ৰমে শক্তিশালী হতে থাকে।
প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ: এক ঐতিহাসিক ও প্রতীকী ঘটনা ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পদত্যাগ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আন্দোলনকারীদের অবস্থান, বিক্ষোভ এবং প্রকাশ্য পদত্যাগের দাবির মুখে তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত ঘটনা ছিল না; বরং এটি বিচার বিভাগের উপর পরিকল্পিত চাপের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের আরও কয়েকজন বিচারপতির পদত্যাগ পরিস্থিতির গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনাগুলো বিচারকদের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা বহন করে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতও “রাস্তার চাপ” থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। এর ফলে বিচারিক স্বাধীনতার ধারণা ও নিরাপত্তাবোধ উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিচারকদের উপর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিচারকদের বিরুদ্ধে প্রচারণা, সমালোচনা এবং পক্ষপাতের অভিযোগের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। কিছু বিচারককে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; আবার অনেকের বিরুদ্ধে “জনবিচারধর্মী” ভাষায় আক্রমণ চালানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারকদের অপসারণ বা পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশে পরিণত হয়। এর ফলে বিচারকদের সামনে এক জটিল দ্বৈত সংকট তৈরি হয়— একদিকে সংবিধান ও আইনের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যার দায়িত্ব, অন্যদিকে জনরোষ, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয় ।
এই বাস্তবতা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বিচার বিভাগে পুনর্বিন্যাস ও সংস্কারের বিতর্ক ৫ আগস্টের পর বিচার বিভাগে দ্রুত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। এর মধ্যে ছিল— নতুন প্রধান বিচারপতির নিয়োগ, আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের পুনর্বিন্যাস, কিছু বিচারকের পদত্যাগ, বিচারিক প্রশাসনে নতুন অগ্রাধিকার নির্ধারণ, এবং বহুল আলোচিত রাজনৈতিক মামলাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন।
সরকারপক্ষ ও সমর্থক মহল এসব পরিবর্তনকে “বিচার বিভাগের সংস্কার” হিসেবে উপস্থাপন করলেও সমালোচকদের প্রশ্ন—এসব কি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নাকি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ? আন্তর্জাতিক মহল থেকে শুরু করে দেশের নানা স্তরে এমন সব বিষয় উঠে আসছে যে এখানে দমন, পীড়ন, নির্যাতন ও হত্যা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ বিচার বিভাগের প্রতি জনআস্থা নির্ভর করে শুধু পরিবর্তনের উপর নয়, বরং সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক ছিল তার উপরও।
একে “বিচার” বনাম “জনআবেগ” না বলে একটি পরিকল্পিত নকশা বললে ভুল হবে না।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল ন্যায়ানুগ দ্রুত বিচার, দুর্নীতির শাস্তি এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের অবসান। কিন্তু ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি হলো—বিচার হবে আদালতে, উস্কে দেয়া সংগঠিত ছাত্র-জনতার চাপে নয়।
যখন আদালতের সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড, রাস্তাঘাটের স্লোগান বা রাজনৈতিক আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়ে, তখন আইনের শাসনের জায়গায় ধীরে ধীরে “আবেগের শাসন” প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এখানেই “মব জাস্টিস” ও “রুল অব ল”-এর মৌলিক সংঘাত।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই ইচ্ছার বাস্তবায়ন অবশ্যই সাংবিধানিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে। অন্যথায় ন্যায়বিচার প্রতিশোধে রূপ নিতে পারে।
২০২৬ সালের নির্বাচন ও বিচার বিভাগের ভূমিকা ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া। এখানেও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে আদালতের সামনে যেসব প্রশ্ন আসতে পারতো , তার মধ্যে ছিল — রাজনৈতিক মামলা, প্রার্থিতা বাতিল বা অযোগ্যতা সংক্রান্ত বিরোধ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ, এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার।
এসব বিষয়ে আদালতের ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু বিচারকরা যদি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, সামাজিক চাপ বা মব-সংস্কৃতির আশঙ্কায় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন, তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এবং হচ্ছে ও তাই.
বিচারিক স্বাধীনতা: গণতন্ত্রের শেষ আশ্রয় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ হলো নাগরিকের শেষ সাংবিধানিক আশ্রয়স্থল। নির্বাহী ও আইনসভা যখন বিতর্কিত বা পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে অভিযুক্ত হয়, তখন জনগণ শেষ ভরসা হিসেবে আদালতের দিকে তাকায়। কিন্তু আদালত নিজেই যদি ভয়, চাপ ও জনআবেগের মধ্যে পরিচালিত হয়, তবে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচার বিভাগের সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন হতে পারে। তবে সেই সংস্কার হতে হবে— সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, এবং বিচারিক স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে।
রাস্তার চাপ, আবেগনির্ভর জনআন্দোলন বা মব-সংস্কৃতির মাধ্যমে বিচার বিভাগ পুনর্গঠন দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা এক গভীর রূপান্তর ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকদের পদত্যাগ, আদালতের উপর সংগঠিত জনচাপ, সামাজিক মাধ্যমে বিচারিক ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। গণতন্ত্রে জনগণের শক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই শক্তি যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়, চাপ বা প্রতিশোধের সংস্কৃতির মধ্যে পরিচালিত করে, তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ন্যায়বিচারের প্রকৃত ভিত্তি হলো স্বাধীন আদালত, নিরপেক্ষ বিচারক এবং আইনের শাসনের প্রতি অটল আস্থা—মবের শাসন নয়। “মব কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, নাগরিকতার বিরুদ্ধেও দাঁড়ায়” সঙ্কট উত্তরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিচারবিভাগের স্বাধীনতা।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন