উচ্চশিক্ষায় বিশ্বমানের ঘাটতি: বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বড় বাধা

দেলোয়ার জাহিদ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পরিমাণগত সম্প্রসারণ ঘটলেও গুণগত মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং কর্মমুখী দক্ষতায় স্পষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে উচ্চশিক্ষা কাঠামোকে আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও দক্ষতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর এখন আর বিলম্ব সহ্য করে না।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে নীতিগত সীমাবদ্ধতার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সুশাসন এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের শক্তিশালী ঐতিহ্য থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের সাথে তার সংযোগ দুর্বল। এর ফলেই শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে আমার যাত্রায় মানবাধিকার, শিক্ষা, মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ, এবং সংঘাত নিরসন বিষয়ে আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি—St. Paul's College, University of Manitoba (২০০২–২০১০), University of Vigo (২০০০–২০০২) এবং University of Education Freiburg (১৯৯৫–১৯৯৯)-এ অধ্যয়ন ও গবেষণার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। গবেষক- হিসেবে আমি Prof. Dr. Goiedo Smith, Prof. Dr. Alberto Penna এবং Prof. Dr. Dean-এর তত্ত্বাবধান ও সংযোগে জ্ঞান অর্জন করেছি। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও সচেতন পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গবেষণাভিত্তিক রূপে পুনর্গঠনে কিছু সুপারিশ রাখতে চাই।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা—কানাডা, স্পেন ও জার্মানির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে—দেখিয়েছে যে, সফল শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো তত্ত্ব ও প্রয়োগের কার্যকর সমন্বয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, তাত্ত্বিক শিক্ষা কখনোই অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এটি দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নীতিনির্ধারণের শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে ওঠে। সমস্যাটি তত্ত্বে নয়, বরং তত্ত্ব ও বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত এগোলেও একটি স্পষ্ট “skill mismatch” বিদ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞান অর্জন হচ্ছে, কিন্তু তা শিল্পখাতের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমাবদ্ধতা, এবং কর্মসংস্থানে শিক্ষার প্রতিফলনের অভাব—এই তিনটি সমস্যা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

শিক্ষাদর্শের দিক থেকে, জন ডিউই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন; পাওলো ফ্রেইরে শিক্ষা কে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন; আর অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে চিন্তা, দক্ষতা ও প্রয়োগের সমন্বিত একটি কাঠামো।

মূল চ্যালেঞ্জসমূহ
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় কয়েকটি মৌলিক সংকট স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান—
মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ধারণাগত বোঝাপড়ার চেয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পায়
তত্ত্ব ও বাস্তবতার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের দুর্বল সংযোগ
গবেষণা অবকাঠামো ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা
আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার


একই সঙ্গে গুণগত বৈষম্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিকীকরণের অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংস্কারের দিকনির্দেশনা
এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা সংস্কারকে হতে হবে সমন্বিত, সাহসী এবং দীর্ঘমেয়াদি—

প্রথমত, একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে, যা মাননিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি—এসব পদক্ষেপ অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সায়েন্স এবং উদ্যোক্তা শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ ও কো-অপ প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করা উচিত।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিকীকরণে জোর দিতে হবে—যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম, বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
পঞ্চমত, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং ডিজিটাল মনিটরিং ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হবে না।
ষষ্ঠত, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পায়।

উপসংহার

উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবন এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি। বাংলাদেশের জন্য উচ্চশিক্ষা এখন একটি কৌশলগত খাত—যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায় এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।

এখন সময় সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ আজকের শিক্ষানীতি নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন