শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশের আরও পাঁচ জেলায় নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের পরিকল্পনার বিষয়টি জেলাপ্রশাসক সম্মেলন-২০২৬ এর প্রথম দিনে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
রোববার (৩ মে) ঢাকায় সচিবালয় সংলগ্ন ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
জেলা প্রশাসক সম্মেলনে একই সঙ্গে খাল খননে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রম আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সম্মেলনে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, লালমনিরহাট এবং গাজীপুর জেলায় নতুন ইপিজেড স্থাপনের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন ইপিজেড গড়ে উঠলে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়নের গতি বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত বা শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে এসব ইপিজেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মত দেওয়া হয়।
সম্মেলনে পরিবেশ ও কৃষি সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে খাল খনন কর্মসূচিকে জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনায় বলা হয়, খাল খনন শুধু মেশিন নির্ভর প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত না হয়ে ছাত্র-ছাত্রী, বেকার তরুণ এবং সাধারণ জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এতে জনগণের অংশগ্রহণ যেমন বাড়বে, তেমনি জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি প্রবাহ সচল রাখা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
খাল খননে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের আহ্বায়ক করে একটি সমন্বিত কমিটি গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ কমিটিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাল পুনঃখনন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সম্মেলনে গুরুত্বারোপ করা হয়। দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পর ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার চেয়ে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ জেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে পূর্বপ্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হয়। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়।
সম্মেলনে ওঁরাও, মাহাতোসহ সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আয়বর্ধক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষিভিত্তিক সহায়তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ সম্পর্কিত আলোচনায় জলাতঙ্ক প্রতিরোধে অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন এবং সাপের কামড় মোকাবিলায় অ্যান্টি ভেনম ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হাম প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদারের কথাও বলা হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মাধ্যমে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ ও ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম পরিচালনা এবং অবৈধ ক্লিনিক ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা হয়। নিরাপদ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জেলার সদর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়।
শিক্ষা খাতে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সমন্বয়ে ‘রিটায়ার্ড টিচার্স পুল’ গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় উঠে আসে, যাতে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান ও দক্ষতা শিক্ষাব্যবস্থায় কাজে লাগানো যায়।
এছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষের মধ্যেই সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ সম্পর্কিত আলোচনায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং মাদ্রাসা ও কওমি শিক্ষার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রথম শ্রেণি থেকে অভিন্ন স্কুল ড্রেস চালুর প্রস্তাব আলোচনা হয়।
একই সঙ্গে বছরব্যাপী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস প্রোগ্রাম, মিড-ডে মিল চালু এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
নতুন কারিকুলামে ভূমি আইন, ট্রাফিক আইনসহ বাস্তবমুখী সাধারণ জ্ঞান অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন