মাদ্রাসা শিক্ষা : অনাচার ও আত্মশুদ্ধির দায়

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।|

সমস্যাটি এখন ভিন্ন দিকে গড়াচ্ছে। স্যোশাল মিডিয়ায় গোটা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকেই দোষারোপ করা আরম্ভ হয়েছে। এতে যেমন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপার আছে, তেমনি আছে বিদেশী এজেন্ডাও। বাংলাদেশে যিনি নিজেকে পিওর নাস্তিক বলে দাবি করছে, তার মধ্যেও আছে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বিদ্বেষ। ধর্ম শিক্ষা, হুজুর— এসবের ওপর কারো কারো এলার্জি আজন্মকালের। মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার মৌলভি কিংবা বাড়িতে বাড়িতে আমপারা এবং মৌলুদ শরীফ পড়ানো মুনশির মর্যাদা এখানে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের! হুজুরদের প্রয়োজন হয় নিকাহে এবং জানাযায়! বাকি সময় তারা উপেক্ষিত থাকে। 

 

মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে বড় বড় গোষ্ঠীর বিরোধিতা আছে। প্রণীত সর্বশেষ শিক্ষানীতিতেও একমুখী শিক্ষার কথা বলে মাদ্রাসা শিক্ষাকে কার্যত কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, কিন্ডারগার্টেন, নূরানী মাদ্রাসা এবং কওমি মাদ্রাসা সিলেবাস ও কারিকুলাম কতটা যুগোপযোগী, কতখানি মানসম্মত তা খতিয়ে দেখাও দরকার। সরকারও এক্ষেত্রে মাঝে মাঝে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। যারা দানের টাকায়, সদকা ও যাকাতের টাকায়, বিদেশীদের টাকায় পরিচালিতড় তারা অন্যকে কৈফিয়ত দিতে কতটা বাধ্য— সেটাও প্রশ্ন। কারো সনদকে কেবল স্বীকৃতি দিলেই সেটা সত্যিকারার্থে এবং বাস্তবিকপক্ষে সমমান হয়ে ওঠে না। 

 

কিছু কিছু মাদ্রাসার কতিপয় শিক্ষক অনৈতিকতার সাথে জড়িয়েছে। তাদের চারিত্রিক অবদমনের দায়ভার বয়ে বেড়াতে হচ্ছে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত তাদের সবাইকে। সমস্যা আসলে বহুমাত্রিক। প্রথমতঃ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি না করে, শাস্তি না দিয়ে বরং তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ায় প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ কারো বিরুদ্ধে যখন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে তখন সেটা চাপানো হয় গোটা ব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত তাদের সবার ওপর। যে কারণে কোনো অভিযোগের বিপরীতে সুষ্ঠু সুরাহা না হয়ে বরং অপরাধ মূলে ও কাণ্ডে বাড়তে থাকে। কথিত আছে, বাঙালিয়ানায় দ্বিচারিতা সেকেলের স্বভাব। যারা অন্যের অন্যায়ে সরব হয়, তারা নিজেদের অন্যায়ে নিরব থাকছে। আলেম সমাজের একাংশও এই দ্বিচারিতায় ভুগছে। 

 

অতীতের একটা সময় মাদ্রাসায় কেবল পিছিয়ে থাকা শ্রেণির ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করতো। কেননা সেখানে থাকা-খাওয়া প্রায় ফ্রি ছিল। ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষার বিনিময়ে যদি কিছু পরিশোধ করতে হতো তাও খুবই সামান্য অঙ্কের ছিল। যা বহনের সামর্থ্য সমাজের সেই শ্রেণির জন্যও অসম্ভব ছিল না। তবে এখন সময় বদলেছে। কিছু কিছু মাদ্রাসায় শিক্ষার খরচ অনেক জেনারেল প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি। মানসম্মত এবং যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত হওয়ার কারণে সমাজের ধনাঢ্য, শিক্ষিত এবং অভিজাত শ্রেণির অনেক ছেলেমেয়ে এখন মাদ্রাসায় পড়ে। সামাজিক সমস্যা বিশ্লেষণের পরে একথাও স্বীকৃত হয়েছে যে, মোরালডিগনিতে মাদ্রাসায় পড়ুয়ারা অন্যদের চেয়ে এখনও আংশিক হলেও এগিয়ে আছে। যদিও এ বিষয়ে এখন গবেষণা হওয়ার দাবি রাখে। 

 

শহর-নগরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এগিয়ে যাচ্ছে ধর্মীয় পদ্ধতির শিশু শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। বাহারি বিজ্ঞাপন এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। যদি সেকেলে চিন্তা করা হতো তাহলে এই পদ্ধতির শিক্ষার সম্প্রসারণ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশি হওয়া আবশ্যক ছিল। অথচ গ্রামের চেয়ে শহরে মাদ্রাসা, নূরানী মাদ্রাসা এখন সংখ্যাধিক্য। মানুষের মানসিকতা যেমন বদলেছে তেমনি সরকারি প্রাথমিকের বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন সময়সূচি এবং ছুটির বর্ষপঞ্জি-ও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দায়িত্ব এবং আন্তরিকতার প্রশ্নটিও সামনে আনছে। অথচ বেতনের পার্থক্য আকাশ-ছায়াপথের দূরত্বের। 

 

মাদ্রাসা শিক্ষায় অনাচার হচ্ছে না— এটা অস্বীকারের সাধ্য এখন আর নাই। তবে এটা সমাজের সামগ্রিক চরিত্রহীনতা ও নৈতিক সংকটের আংশিক রূপ। জাতীয়ভাবেই আমাদের চারিত্রিক এবং নৈতিক সংকট তীব্রতর হয়ে চলছে। শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ধর্ষণ যদি শক্ত হাতে দমন করা না যায় তবে মাদ্রাসা তো দূরের কথা ভবিষ্যতে মসজিদ-মন্দিরের পবিত্রতাও রক্ষা পাবে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান আছি। নেশার বেড়াজালে গোটা সমাজব্যবস্থা ডুবে আছে। জুয়ার জাল সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে। এসব থেকে সন্তানকে মুক্ত রাখতে এখনও মাদ্রাসা শিক্ষাই উল্লেখযোগ্য বিকল্প। সেখানেও যে সংক্রমণ ঘটেনি তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, তবে তুলনামূলক বিবেচনায় এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যায়নি। অভিভাবকগণ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজে পেতে সন্তানকে ধর্ম শিক্ষা দিতে ঝুঁকছে।  

 

ইসলামিক স্কলার ও ভাবাদর্শের ব্যক্তিবর্গকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার দুর্নামে যাদের অংশগ্রহণ আছে তাদেরকে শক্তহাতে দমন করতে হবে। শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের বাবার মতো, ভাইয়ের মতো হওয়ার দরকার নাই। শিক্ষককে তার সীমা জানতে ও মানতে হবে। শিক্ষার্থীকে পাপ্পি দেওয়া, শরীরে আদর করার আব্দার করা— এসব মানসিক সুস্থতার লক্ষণ নয়। আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে লিঙ্গভেদে শিক্ষকদেরও লিঙ্গভেদ করতে হবে। মহিলা দিয়েই মহিলা মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত করতে হবে। দুনিয়া ও আখেরাতের বিবেচনায় ধর্ম শিক্ষা আবশ্যকীয়। কিন্ত ধর্ম শিক্ষার আয়োজন করে যদি সেখানে অধর্মের কার্যকলাপ হয় তবে তা কঠিন হস্তে দমন করাও ধর্ম নির্ধারিত দায়িত্ব। আইনকে এ ব্যাপারে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ হতে দিতে হবে। অপরাধীকে অপরাধের বিবেচনায় বিচার করতে হবে। কে মৌলভি, কে সমাজে সম্মানিত সেটা বিবেচনা করে অপরাধ প্রতিহত করা এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিচার করতে হবে অপরাধের; অপরাধীর পরিচয় বিবেচনায় নয়। 

 

মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার তা হাওয়ায় বাড়তে দেওয়া যাবে না। ধর্মের বিরুদ্ধে বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে একটা গোষ্ঠী গুজব-অপতথ্য রটাতে সদা তৎপর। সেই কুচক্রীমহলকে কোনো সুযোগ দিতে না চাইলে নিজেদের মধ্যে থাকা দোষ ও ভুলগুলো স্ব-উদ্যোগে শুধরে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। আলেমদের আত্মসমালোচনা করা খুব জরুরি। এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল মহলকে আরও করিৎকর্মা হতে হবে। ধর্মীয় আবেগে, আলেমদের মর্যাদা অন্যসকল মানুষের থেকে বেশি। যাদের মর্যাদা শানিত, তাদের দোষের ধকলও বেশি। কাজেই সিরাতের ও সুরতের মর্যাদা রক্ষায় অন্তর্নিহিত তাকওয়া অর্জনের কোনো বিকল্প নাই। এরপরেও যাদের চিত্তকে শয়তান দখল করে নেয়, বিবেকের বিশুদ্ধতা যাদেরকে মানুষ বানাতে পারে না— তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সেই শাস্তি অবশ্যই ধর্ম না জানা মানুষের চেয়ে বেশি এবং জোড়ালো হওয়া আবশ্যক। যাদের কাছে প্রত্যাশা বেশি, তারা তা রক্ষায় ব্যর্থ হলে তাদের প্রতি ঘৃণার আধিক্যও বেশি। ধার্মিকদের চলার পথ মসৃণ নয়। প্রতি পদে পদে তাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। কারো পদচ্যুতি ঘটলে তাকে শোধরাতে সর্বোচ্চ কঠোর পন্থা বেছে নিতে হবে।

 

 

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন