ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দুঃখে ধৈর্য ও সুখে কৃতজ্ঞতা- তিন ব্যক্তির ঘটনা থেকে শিক্ষা

শায়খ জামাল আবদিনাসির ||


মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা-দারিদ্র্য এবং সুস্থতা-অসুস্থতা—সবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। মানুষ সাধারণত বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টকে পরীক্ষা মনে করে। কিন্তু ধনসম্পদ, সুস্বাস্থ্য ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও যে আল্লাহর পরীক্ষা, তা অনেক সময় ভুলে যায় । প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং সুখে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। জীবনের প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ রাখা এবং মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।

কথাগুলো বলেছেন শায়খ জামাল আবদিনাসির । ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবায় তিনি কথাগুলো বলেন।

খুতবার শুরুতে পবিত্র কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে দিয়ে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার রব যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করে দেন । তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ও সর্বদ্রষ্টা ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ১৭:৩০)।

তিনি বলেন, আল্লাহ কাউকে সম্পদ দেন, কাউকে অভাবের মধ্যে রাখেন । কাউকে সুস্থতা দেন, কাউকে অসুস্থতার মাধ্যমে পরীক্ষা করেন । এসবের কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয় । আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের ভালো ও মন্দ দ্বারা পরীক্ষা করি।’ (সুরা আম্বিয়া, ২১:৩৫)

এ প্রসঙ্গে তিনি সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত পূর্ববর্তী যুগের তিন ব্যক্তির ঘটনা তুলে ধরেন। তাঁদের একজন ছিলেন কুষ্ঠরোগী, একজন টাকমাথা এবং অন্যজন অন্ধ। তিনজনই ছিলেন দরিদ্র। আল্লাহ তাঁদের পরীক্ষা করার জন্য সাধারণ মানুষের বেশে একজন ফেরেশতা পাঠান।

ফেরেশতা প্রথম ব্যক্তির কাছে জানতে চান, তিনি কী চান। তিনি সুস্থ ও সুন্দর ত্বক ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর রোগ দূর হয় এবং তাঁকে মানুষের বেশধারী ফেরেশতার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে  একটি গর্ভবতী উটনী দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় ব্যক্তি সুন্দর চুল ফিরে পান এবং তাঁকে একটি গর্ভবতী গাভি দেওয়া হয়। তৃতীয় ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে একটি গর্ভবতী ভেড়া দেওয়া হয়।

সময়ের ব্যবধানে তিনজনই বিপুল সম্পদের মালিক হন । প্রত্যেকের পশুসম্পদে উপত্যকা ভরে যায়।

শায়খ জামাল বলেন, এরপর ফেরেশতা একদিন অসহায় মুসাফিরের বেশে তাঁদের কাছে ফিরে আসেন । প্রথম ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাইলে তিনি নানা অজুহাত দেখিয়ে সাহায্য দিতে অস্বীকৃতি জানান । অতীতের দারিদ্র্য ও অসুস্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি দাবি করেন, এসব সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তিও একই আচরণ করেন। ফলে তাঁদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমাকে দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, আল্লাহ আমাকে সম্পদ দিয়েছেন । আপনার যত প্রয়োজন নিয়ে যান।’

তখন ফেরেশতা জানান, এটি ছিল আল্লাহর পরীক্ষা । আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং অপর দুই ব্যক্তির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

এই ঘটনার শিক্ষা তুলে ধরে খতিব আবদি-নাসির বলেন, প্রথম শিক্ষা হচ্ছে সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। অভাবের মধ্যে ধৈর্য ধরতে হবে এবং প্রাচুর্যের মধ্যে অতীতের কষ্ট ভুলে যাওয়া যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের চেয়ে নিচের অবস্থানের মানুষের দিকে তাকাও, উপরের অবস্থানের মানুষের দিকে নয়। তাহলে আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করবে না।’ (সহিহ মুসলিম)

তিনি বলেন, দ্বিতীয় শিক্ষা হলো জীবনের পরীক্ষা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে। নবী-রাসুলগণও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই বিপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। মানুষের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা সবসময় খোলা থাকে।

তৃতীয় শিক্ষা হলো অন্তরকে লোভ ও কৃপণতা থেকে মুক্ত রাখা। তিনি বলেন, সম্পদ মানুষকে অহংকারী করে তুলতে পারে। আবার সেই সম্পদই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা নিজেদের অন্তরের কৃপণতা থেকে রক্ষা পেয়েছে, তারাই সফল।’ (সুরা হাশর, ৫৯:৯)

শায়খ জামাল বলেন, দান করার জন্য ধনী হওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়। আল্লাহ মুত্তাকিদের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘তারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে।’ (সুরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)

তিনি বলেন, আমাদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও সোমালিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অসংখ্য অসহায় মানুষ সাহায্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের সাহায্যের সুযোগকে এড়িয়ে না গিয়ে কাজে লাগাতে হবে। অর্থ দিয়ে সাহায্য করা সম্ভব না হলেও সময়, পরামর্শ, সহানুভূতি ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

খুতবার শেষাংশে শায়খ জামাল আবদি-নাসির মুসল্লিদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের সেই দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া ব্যক্তির মতো হতে হবে, যিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও নিজের অতীত এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ভুলে যাননি । আমাদের মনে রাখতে হবে, সম্পদ ও সুস্থতা চিরস্থায়ী নয় । আল্লাহ যখন যা দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং মানুষের কল্যাণে তা কাজে লাগাতে হবে।

পরিশেষে তিনি মহান আল্লাহর কাছে বিপদে ধৈর্য, সুখে কৃতজ্ঞতা এবং মানুষের প্রতি উদারতা প্রদর্শনের তাওফিক কামনা করেন।

শায়খ জামাল আবদিনাসির : অতিথি খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমা'র খুতবা, ১৬ অক্টোবর ২০২৬।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন