ভেরিফিকেশনে সত্যের কতটুকু ? কিংবা  অভিযোগের আড়ালে সত্য

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

বিয়ের লক্ষ্যে পাত্রী দেখতে গেলেন! পাত্রী দেখে ঘরে ফেরার আগে পাত্রীর সম্পর্কে উল্টাপাল্টা শত শত মিথ ও মিথ্যা তথ্য আপনার বাড়িতে পৌঁছাবে। আমি একবার এক আত্মীয়ার জন্য পাত্র দেখতে গিয়েছিলাম। পাত্রের আপন চাচী পাত্র সম্পর্কে যা বলেছে, তাতে সেই পাত্রের দশ জনমেও বিয়ে হওয়ার কথা নয়! মানুষও এমন করেও বলতে পারে! বিয়েতে ভাঙানি গ্রাম-সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি!  

 

প্রতিবেশীর কারও পুত্র-কন্যা চাকরি পাবে—এটা সহ্য করার মতো মানসিকতা এখনকার গ্রাম-সমাজে অনেকেরই নেই। গরু বিক্রি করে, ধান ও পেঁয়াজ বিক্রি করে থানায় গিয়ে পাশের ঘরের ধার্মিক ভদ্রলোক টাকা দিতে চায়— যাতে তাদের নামে রিপোর্ট খারাপ হয়। আড়ালে একজন আরেকজন সম্পর্কে যা মন্তব্য করে, তাতে শয়তান দূরে দাঁড়িয়ে হাসে আর ভাবে, গ্রামে তার আর কোনো কাজ নেই!

 

রাজনীতিতে বিরোধীদলীয় দ্বন্দ্বের কথা তো আছেই; নিজ দলের মধ্যেও আত্মকলহ ও গ্রুপিংয়ে দেশ ভরা। কে নমিনেশন পাবে আর কে পাবে না, নিজের সমর্থকদের নিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে সৃষ্ট মারামারিতে আহতদের চিকিৎসা করতে গিয়ে হাসপাতালে আসল রোগীর জন্য জায়গা থাকে না। নিজের দলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হামলা-মামলা, অপপ্রচার-বিষোদ্গার এখন অনেকের রাজনৈতিক হাতিয়ার। এক প্রতীকের প্রতিপক্ষকে দমাতে কারও কারও কাছে অন্যের চরিত্রহননও রাজনৈতিক কৌশল হয়ে ওঠে।

 

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সদস্যদের সারাদেশে নিজস্ব ও বিশ্বস্ত সোর্সের সংখ্যা কেমন, তা আমি জানি না। স্ব স্ব এলাকার চৌকিদারকে যদি বিশ্বস্ত সোর্স ভাবা হয়, তবে সত্য ডুবছে। আগের যুগের মতো নিরপেক্ষ ও মান্যবর ব্যক্তিবর্গও গাঁও-গেরামে নাই বললেই চলে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের নিজেদের স্বার্থ, পক্ষপাত কিংবা স্থানীয় বিরোধের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ তথ্য দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। সেখানে অন্যের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন নিয়ে নানা মন্তব্যের ভিত্তিতে গ্রাম্য রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

 

ইমাম-পুরোহিত, সাধু-শিক্ষক কিংবা স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির কাছ থেকে এখন আর কারও সম্পর্কে আসল সত্য জানা সবসময় সম্ভব নয়। কারণ তাঁরাও সমাজেরই মানুষ; তাদের তথ্যেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পক্ষপাত বা স্থানীয় বিরোধের প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ওপর নির্ভর করলেও সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সবসময় নিশ্চিত নয়। গোটা সমাজব্যবস্থার এই দুর্বলতার কারণ কারা তৈরি করেছে, সে আলাপ আরেকদিন। আচ্ছা, আলাপ করা লাগবে কেন? আপনি বোঝেন না!

 

কেবল সনদ জালিয়াতি, ফৌজদারি অপরাধ কিংবা পরীক্ষায় অনিয়ম চিহ্নিতকরণের মতো সুস্পষ্ট ও প্রমাণযোগ্য কারণে কাউকে চাকরিতে নিয়োগের অযোগ্য বিবেচনা করা এক বিষয়; আর চাকরি পাওয়ার পরে অতীতের ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক অপপ্রচার কিংবা অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে সম্মান ও রিজিক থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অতীতের অন্যায়ের প্রতিশোধ কিংবা প্রতিবেশীকে সামনে এগোতে না দেওয়ার মানসিকতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। দু-একজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাদের ন্যায়বিচারের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু যাচাইয়ের নামে নির্বিচারে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতির পরিণতি কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।

 

যে সমাজে চাচা ভাতিজার নামে মামলা আগাম ফাইল করে রাখে, যাতে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায়, সেখানে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে দেওয়া নেতিবাচক তথ্যের উৎস ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। রাষ্ট্রীয় নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস, অভিযোগের প্রকৃতি এবং যাচাইয়ের পদ্ধতি যতটা সম্ভব নির্ভরযোগ্য, ন্যায়সংগত ও যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। কারণ ভেরিফিকেশন একটি মানুষের শুধু চাকরি নয়, তার সামাজিক মর্যাদা ও একটি পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।

 

সরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশন একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া। তবে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুনর্বিবেচনা বা পুনঃভেরিফিকেশনের সুযোগ থাকা ন্যায়সংগত। ২০২৫ সালে সরকারি চাকরির প্রাক-পরিচয় যাচাইয়ের নতুন বিধিমালার খসড়াতেও অনুপযুক্ত ঘোষিত ব্যক্তির পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ রাখার কথা প্রকাশিত হয়েছিল।  ২০২৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে বাদ পড়া নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে পুনঃতদন্ত ও কারণ স্পষ্ট করার দাবিও উঠেছে।

 

নিঃসন্দেহে অতীতে অন্যায় হয়েছে। সেই অন্যায়গুলোরও ন্যায়বিচার করতে হবে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আবার অন্যায়ের পথ বেছে নেওয়া ন্যায্য হবে না; কাম্য তো নয়ই। কেউ অধম ছিল না বলিয়া আমি উত্তম হইবার পথ দেখাব না— তা হয় না।

 

ভেরিফিকেশনে যারা বাদ পড়েছেন, তাদের দ্রুত পুনঃভেরিফিকেশন বা ন্যায়সংগত পুনর্বিবেচনার আওতায় আনা প্রয়োজন। বাদ পড়া চাকরিজীবী ও চাকরিপ্রার্থীদের পরিবারের ওপর দিয়ে যে সামাজিক অসম্মান ও অনিশ্চয়তা যাচ্ছে, তা থামানোর পথ খুঁজতে হবে। তাদের মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ারও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। চাকরি না পাওয়া যতটা কষ্টের, চাকরি পাওয়ার পরও পদে বসতে না পারার কষ্ট অনেকের জন্য তার চেয়েও গভীর। কারণ তখন প্রত্যাশা তৈরি হয়, পরিবার স্বপ্ন দেখে, আর শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তা সেই স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। লজ্জা ও হতাশা আত্মহননের পথ আবিষ্কারের ঝুঁকি বাড়ায়। 

 

রাষ্ট্রের কাছে তাই আকুতি— সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা হোক। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য অভিযোগ আছে, তাদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর যাদের বিরুদ্ধে কেবল অপপ্রচার, ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা যাচাই-অযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিরূপ প্রতিবেদন এসেছে, তাদের ন্যায্যতার সঙ্গে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হোক।

 

একজন মানুষের একটি চাকরিতে শুধু একজন মানুষের জীবন বদলায় না; একটি পরিবার বেঁচে যায়, একটি পরিবারের স্বপ্ন টিকে থাকে। রাষ্ট্র যদি এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করে, ন্যায়, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তবেই কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি আরও শক্ত হবে।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন