শায়খ আব্দুল কাইয়ুম ||
ইসলামে জ্ঞানার্জনের কোনো বয়সসীমা নেই। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ, মধ্যবয়সী ও প্রবীণ—প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দ্বীনি জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। কারণ, ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জন শুধু শিক্ষার বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও।
২ অক্টোবর শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আব্দুল কাইয়ুম কথাগুলো বলেন।
তিনি বলেন, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের যেসব নিয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো উপকারী জ্ঞান। বিশেষ করে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও অন্যকে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহুস্তরে উন্নীত করবেন।’ (সুরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১১)
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, দ্বীনি শিক্ষা শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য। অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদরাসায় পাঠান, মসজিদে কুরআন শেখার ব্যবস্থা করেন, কিন্তু নিজেরা নতুন করে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন অনুভব করেন না। অথচ এ ধরনের চিন্তাভাবনা মানুষকে আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করে।
তিনি বলেন, এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে আল্লাহ তা'আলা এভাবে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন: ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।’ (সুরা ত্বহা, ২০:১১৪)। যেখানে মহানবী (সা.)-কেও জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে বলা হয়েছে, সেখানে সাধারণ মুসলমানদের জন্য জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।
তিনি উল্লেখ করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)। দ্বীনের সঠিক উপলব্ধি অর্জনের জন্য নিয়মিত অধ্যয়ন, চিন্তাভাবনা এবং আলেমদের সাহচর্য প্রয়োজন।
সাহাবায়ে কেরামের উদাহরণ তুলে ধরে শায়খ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, তাঁদের অনেকেই মধ্যবয়সে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বয়স তাঁদের জ্ঞানার্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দ্বীনি শিক্ষা অর্জনে নিয়োজিত ছিলেন।
তিনি বলেন, বিখ্যাত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একজন মানুষ কত দিন পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করবে? তাঁর উত্তরের মর্মার্থ ছিল, ‘দোয়াত-কলম থেকে কবর পর্যন্ত ।’ অর্থাৎ একটি শিশু যখন দোয়াত কলমের মাধ্যমে লেখা-পড়া শুরু করে সেই সময় থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এখানে দোয়াত-কলম বলা হয়েছে এ কারণে যে, একসময় লেখার জন্য দোয়াত-কলম ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যম ছিলোনা। শিশু বয়সে দোয়াত কলমের মাধ্যমেই লেখালেখি শুরু করতে হতো।
জ্ঞানার্জনের পথে বিভিন্ন অজুহাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকেই বয়স, কর্মব্যস্ততা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে দ্বীনি শিক্ষা থেকে দূরে থাকেন। কেউ মনে করেন, ছোটবেলা থেকে নামাজ পড়ছেন, কুরআন পড়তে জানেন, তাই নতুন করে শেখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন নামাজ আদায় করলেও নামাজের শুদ্ধতা, একাগ্রতা এবং ইসলামের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, একজন মুসলমানের জন্য হালাল-হারাম, বৈধ উপার্জন, মানুষের অধিকার, আত্মশুদ্ধি, প্রয়োজনীয় দোয়া-জিকির এবং আখিরাতের প্রস্তুতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন জরুরি। মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়টি স্মরণ রেখে প্রত্যেকের জীবন পরিচালনা করা উচিত।
জ্ঞানার্জনের মর্যাদা সম্পর্কে শায়খ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুসলিম)। এই সুসংবাদ শুধু তরুণদের জন্য নয়, বরং সব বয়সের মুসলমানের জন্য প্রযোজ্য।
দ্বীনি জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুটি বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সপ্তাহে অন্তত একটি দ্বীনি শিক্ষার মজলিসে অংশগ্রহণ করা। সেটি তাফসির, হাদিস, ফিকহ কিংবা মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিতবিষয়ক আলোচনা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নিয়মিত অর্থসহ পবিত্র কুরআন অধ্যয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কুরআনের অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। বছরে অন্তত একবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থসহ কুরআন পাঠের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে কুরআনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং নামাজে তিলাওয়াত করা আয়াতগুলোর মর্ম উপলব্ধি করা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক মানুষ লজ্জা বা সংকোচের কারণে ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ কিংবা প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকেন। অথচ প্রখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, লজ্জাশীল ও অহংকারী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। এখানে লজ্জা বলতে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে অযথা সংকোচকে বোঝানো হয়েছে।
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বয়স, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান কোনো বাধা হতে পারে না। একজন আলেম কিংবা শিক্ষককেও নিয়মিত অধ্যয়ন করতে হয়। কারণ, জ্ঞানার্জনের কোনো অবসর নেই। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শেখার আগ্রহ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
খুতবার শেষাংশে তিনি সবাইকে উপকারী জ্ঞান অর্জন, অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে সবার জন্য উপকারী জ্ঞান ও সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক কামনা করেন।
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার। জুমার খুতবা, শুক্রবার ২ অক্টোবর ২০২৬।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন