শায়খ আনিসুল হক ||
মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতাগুলোর একটি হলেও মানুষ এ নিয়ে খুব কমই চিন্তা করে। মানুষের উচিত মৃত্যুকে স্মরণ করে নিজের জীবন, আমল ও রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।
২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার খুতবায় কথাগুলো বলেছেন, ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম শায়খ আনিসুল হক । সম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা যাওয়া যুবক ইদরিস ফাইজির জীবন ও মৃত্যু নিয়ে এক প্রতিফলনমূলক বক্তব্য রাখেন তিনি।
শায়খ আনিসুল হক বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” অথচ মানুষ আগামী বছর, সন্তান, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করে এমনভাবে যেন আগামীকাল তাঁর বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা আছে। বাস্তবে কারও জন্য আগামীকাল নিশ্চিত নয়।
তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ আগে আমাদের নিজেদের কমিউনিটিতেই এই বাস্তবতা অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে সামনে আসে। ভাই ইদরিসের বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। তিনি ছিলেন সুস্থ, কর্মঠ ও প্রাণবন্ত একজন যুবক। স্ত্রী ও কয়েক মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন তিনি। দ্বীনের দাওয়াহ এবং উম্মাহর কল্যাণ নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন । একটি মুসলিম চ্যারিটি রান-এ অংশ নিতে গিয়ে দৌড় শেষ করার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন ।
শায়খ আনিসুল হক বলেন, ভাই ইদরিস বৃদ্ধ ছিলেন না এবং তার মৃত্যু প্রত্যাশিতও ছিল না। আমাদের সঙ্গে তার একমাত্র পার্থক্য হলো, তার নির্ধারিত সময়টি আমাদের আগে এসে গেছে। তিনি এই মৃত্যু থেকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেন।
প্রথমত, ভালো কাজের ওপর অবিচল থাকা। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) শিক্ষা দিয়েছেন যে, মানুষের আমলের মূল্যায়ন তার শেষ অবস্থার ওপরও নির্ভর করে। কেউ জানে না তার জীবনের শেষ কাজটি কী হবে। ভাই ইদরিসও সেদিন জানতেন না যে, সেটিই হবে তার শেষ যাত্রা। আল্লাহ তাঁকে এমন অবস্থায় ডেকে নিয়েছেন, যখন তিনি একটি কল্যাণমূলক কাজে অংশ নিচ্ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। শায়খ আনিসুল হক বলেন, ভাই ইদরিসের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থলে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরলে তিনি চোখের পানি নিয়েও বলেন, “আল-হামদুলিল্লাহ। আমরা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট এবং আমরা অভিযোগ করি না।” শায়খ আনিসুল হক বলেন, ঈমানের অর্থ এই নয় যে, মানুষ কাঁদবে না বা কষ্ট পাবে না। বরং হৃদয় ভেঙে গেলেও আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং বলা “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব”—এটাই ঈমানের প্রকাশ।
তৃতীয়ত, এমন একটি উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া যা মানুষের উপকারে আসে । তিনি বলেন, মানুষকে তার সম্পদ বা পদবি দিয়ে নয়, বরং তার রেখে যাওয়া কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়। ভাই ইদরিস তরুণ মুসলিমদের সহায়তায় একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন, যুব কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন এবং নিজের স্থানীয় মসজিদের জন্য পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তৈরিতেও অবদান রেখেছিলেন। তার শেখানো তরুণরা এখন সেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
শায়খ আনিসুল হক বিশেষ করে তরুণদের উদ্দেশে বলেন, উত্তরাধিকার রেখে যেতে আলেম হওয়া বা মিম্বরে দাঁড়ানো জরুরি নয়। যে পেশা বা কাজে মানুষ রয়েছে, সেখান থেকেই আল্লাহর দেওয়া যোগ্যতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব।
চতুর্থত, উম্মাহর ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। তিনি বলেন, ভাই ইদরিসের মৃত্যুর পর তার পরিবারকে সহায়তা এবং তার ভালো কাজ অব্যাহত রাখতে মানুষ একত্রিত হয়েছে। অনেকেই তার সম্পর্কে ভালো স্মৃতি শেয়ার করেছেন। এমনকি মুসলিমদের ঐক্য ও ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করে দুইজন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেও তিনি জানতে পেরেছেন।
শায়খ আনিসুল হক বলেন, বিপদের সময় মুসলিমরা কীভাবে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, মৃত ব্যক্তিকে সম্মান করে এবং শোকাহত পরিবারকে সহায়তা করে—সেটিও দাওয়াহর একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
তিনি মরহুম ইদরিস ফাইজির মাগফিরাত কামনা করে বলেন, আল্লাহ যেন তাকে ক্ষমা করেন, নেককারদের মধ্যে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, তাঁর পরিবারকে সবর দান করেন এবং তার রেখে যাওয়া ভালো কাজগুলোকে কবরে তাঁর জন্য চলমান সওয়াবের মাধ্যম বানিয়ে দেন।
শায়খ আনিসুল হক: ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম । জুমার খুতবা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন