ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : কিয়ামত দিবসের হিসাবের আগে নিজের হিসাব নিজেই নিন

শায়খ রাশিদ খান ||

মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে আয়-ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত হিসাব-নিকাশ করে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ঈমান, আমল ও আখিরাতের প্রস্তুতি নিয়ে কতটুকু আত্মসমালোচনা করে? দুনিয়ার জীবনে প্রতিটি কাজের হিসাব রাখার পাশাপাশি পরকালের জন্য কতটুকু সঞ্চয় করা হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে হিসাব দেওয়ার আগেই নিজের ভালো-মন্দ কাজের পর্যালোচনা করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। ইসলামে এই আত্মপর্যালোচনাকে বলা হয় ‘মুহাসাবা’। কথাগুলো বলেছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খ রাশিদ খান । গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় কথাগুলো বলেন।

শায়খ রাশিদ খান বলেন, আমরা অনেকেই রাসুলুল্লাহ (সা:) এর সাহাবি হযরত হানযালা (রা.)-এর ঘটনা জানি। একদিন তিনি কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বের হলেন। পথে হযরত আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে দেখা হলে বললেন, ‘হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে।’

আবু বকর (রা.) কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমরা যখন রাসুলুল্লাহ (সা:) এর কাছে থাকি, জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা শুনি, তখন মনে হয় সবকিছু চোখের সামনে দেখছি । কিন্তু ঘরে ফিরে পরিবার, ব্যবসা ও দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হলে সেই অনুভূতি আর থাকে না।

এ কথা শুনে আবু বকর (রা.) জানালেন, তাঁরও একই অবস্থা। তাঁরা দুজন রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর কাছে গেলে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, মানুষের ঈমানি অনুভূতি সব সময় একই রকম থাকে না। কখনো ইবাদতে গভীর মনোযোগ আসে, আবার কখনো দুনিয়ার প্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত হতে হয়। এটাই স্বাভাবিক । (সহিহ মুসলিম)

শায়খ রাশিদ খান বলেন, এই ঘটনা থেকে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার আছে। সাহাবিরা নিজেদের ভালো মুসলমান মনে করে আত্মতুষ্টিতে ভুগতেন না। বরং নিজেদের ঈমান ও আমলের হিসাব নিতেন এবং সংশোধনের চেষ্টা করতেন।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে অবাস্তব আশা পোষণ করে।’ (তিরমিজি)

তিনি বলেন, আমরা ব্যবসার হিসাব রাখি, ব্যাংকের লেনদেন পরীক্ষা করি, স্বাস্থ্যের যত্ন নিই । কেউ খাবারের ক্যালরি হিসাব করেন, কেউ প্রতিদিন কতটুকু হাঁটলেন তা দেখেন। কিন্তু যে দ্বীন আমাদের আখিরাতে মুক্তির পথ দেখাবে, সেই দ্বীনের ব্যাপারে আমরা অনেক সময় উদাসীন থাকি।

হযরত উমর (রা.)-এর একটি বাণী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেরাই নিজেদের হিসাব গ্রহণ করো।’

পবিত্র কোরআনের সুরা হাশরের ১৮ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে শায়খ রাশিদ খান বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকের উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী পাঠিয়েছে তা পর্যালোচনা করা।’

তিনি বলেন, এখানে আগামীকাল বলতে আখিরাতকে বোঝানো হয়েছে। এমন এক জীবন, যার কোনো শেষ নেই। অথচ আমরা দুনিয়ার সাময়িক জীবন নিয়ে যতটা চিন্তা করি, আখিরাতের অনন্ত জীবন নিয়ে ততটা ভাবি না।

তিনি আরও বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে। সেদিন আমলনামা দেখে পাপীরা বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন কিতাব, যা ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি!’ (সুরা কাহফ, ১৮:৪৯)।

শায়খ রাশিদ খান বলেন, আত্মহিসাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামাজিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ । আমাদের আচরণ, কথাবার্তা, প্রতিবেশীর অধিকার, সমাজের পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যের প্রতি দায়িত্বশীলতার বিষয়েও আত্মসমালোচনা করতে হবে। কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে অহংকার না করে বিনয়ের সঙ্গে উপদেশ গ্রহণ করা উচিত।

খুতবার শেষ পর্যায়ে তিনি মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতিদিন সম্ভব না হলে অন্তত প্রতি শুক্রবার কয়েক মিনিট সময় বের করে নিজের ভালো ও মন্দ কাজগুলোর পর্যালোচনা করুন । নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই সপ্তাহে কী ভালো কাজ করেছি? কাকে কষ্ট দিয়েছি? কারও অধিকার নষ্ট করেছি কি না? কোন ভুলটি সংশোধন করা প্রয়োজন?

তিনি বলেন, নিজের ভুল স্বীকার করুন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভালো কাজগুলো অব্যাহত রাখার সংকল্প করুন । সন্তানদেরও আত্মহিসাবের শিক্ষা দিন। মনে রাখতে হবে, আত্ম-সমালোচনা দুর্বলতা নয়; বরং ঈমান, বিনয় ও আত্মশুদ্ধির পরিচয়।

পরিশেষে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেদের হিসাব নেওয়ার তাওফিক, অহংকার থেকে মুক্তি এবং কিয়ামতের দিন সফলকাম হওয়ার জন্য দোয়া করেন।

শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ । জুমার খুতবা, শুক্রবার ৯ অক্টোবর ২০২৬।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন