মার্কিন নীতিবিশ্লেষক ও সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইকেল রুবিনের গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন

বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্তর্জাতিক প্রমাণমান ও জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর প্রাণহানি অনুসন্ধানে যাচাইয়ের অপরিহার্যতা প্রসঙ্গে

দেলোয়ার জাহিদ ||

ভূমিকা: বিতর্কের কেন্দ্রে নিহতের সংখ্যা ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহি

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণআন্দোলন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আন্দোলনটি সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও ক্রমে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষ, কথিত রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং সরকার পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হয়। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই পরিবর্তনের সাংবিধানিক ভিত্তি, রাজনৈতিক পরিণতি এবং বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য ও আন্দোলনকারীদের স্ববিরোধিতা রয়েছে।

এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় যখন মার্কিন নীতিবিশ্লেষক ও সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে Middle East Forum-এ প্রকাশিত “U.N. Supported the 2024 Coup in Bangladesh; It Was Based on a Lie” শিরোনামের নিবন্ধে জাতিসংঘের নিহতের সংখ্যা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নিবন্ধে তিনি দাবি করেন, ১,৪০০ জন নিহতের অনুমান যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে সেটিকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা সমস্যাজনক। তিনি নিহত ব্যক্তিদের নামভিত্তিক তালিকা এবং জাতিসংঘের গণনাপদ্ধতির ভিত্তি প্রকাশের আহ্বান জানান।

রুবিনের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতিগত বিতর্কের অংশ। তবে তাঁর নিবন্ধের শিরোনামে ব্যবহৃত ‘মিথ্যা’ বা ‘অভ্যুত্থান’ শব্দগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায় কিনা; এগুলো তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ও বিশ্লেষণধর্মী অবস্থানের অংশ কিনা ভেবে দেখতে হবে । একইভাবে, জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলেই তার প্রতিটি অনুমানকে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। প্রয়োজন হলো—উভয় পক্ষের দাবি প্রমাণ, পদ্ধতি এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে অনতিবিলম্বে পরীক্ষা করা প্ৰয়োজন ।

আইনজীবীর চ্যালেঞ্জ: ১,৪০০, ৮৩৪ ও ৬৫০—তিনটি সংখ্যার তাৎপর্য

২০২৬ সালের ২৮ মে শেখ হাসিনার পক্ষে লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ককে চিঠি দিয়ে OHCHR-এর প্রতিবেদনে উল্লেখিত সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহতের অনুমান প্রকাশ্যে সংশোধন বা প্রত্যাহারের দাবি জানান। *NDTV* এবং *bdnews24.com*-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনজীবী তাঁর আপত্তির পক্ষে তিনটি বিষয়কে  সামনে আনেন।

প্রথমত, বাংলাদেশের সরকারি গেজেটে ৮৩৪ জনের নাম থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি জাতিসংঘের অনুমানের সঙ্গে সংখ্যাগত পার্থক্য তুলে ধরেন। দ্বিতীয়ত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে উদ্ধৃত ৬৫০ জন নিহতের হিসাবের উল্লেখ করেন। তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে OHCHR-এর তদন্ত পরিচালিত হওয়ায় তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, নিহতের সংখ্যা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপিত হয়ে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জের প্রমাণমূল্য যথাযথভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। আইনজীবীর চিঠি প্রমাণ করে যে জাতিসংঘের হিসাবের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি তোলা হয়েছে। কিন্তু চিঠিতে উদ্ধৃত ৮৩৪ ও ৬৫০ জনের হিসাবের পরিধি, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড জাতিসংঘের পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা না করে ১,৪০০ জনের অনুমানকে ভুল ঘোষণা করা যায় না। একই ব্যক্তির নাম একাধিক তালিকায় এসেছে কি না, তালিকাগুলোতে কোন সময়সীমার মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, পুলিশ ও অন্যান্য ব্যক্তির মৃত্যুর হিসাব কীভাবে বিবেচিত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। এছাড়াও সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সহ সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে  তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

অতএব, বিতর্কটির বৈজ্ঞানিক সমাধান রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নয়; বরং উৎসভিত্তিক তথ্য যাচাই, নামভিত্তিক তালিকার তুলনা এবং স্বাধীন পুনঃপরীক্ষার  মধ্যে নিহিত।

মাইকেল রুবিন: পরিচিতি ও তাঁর বক্তব্যের সীমা

মাইকেল রুবিন American Enterprise Institute (AEI)-এর সঙ্গে যুক্ত একজন মার্কিন নীতিবিশ্লেষক এবং সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা। তাঁর গবেষণা ও লেখালেখিতে ইরান, তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তাঁর বিশ্লেষণ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সংঘাত, কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক ইসলাম এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে বিস্তৃত বিতর্কের অংশ।

বাংলাদেশ সম্পর্কে রুবিনের বক্তব্যকে তাই আন্তর্জাতিক নীতিগত বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাঁর পরিচিতি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা কোনো বক্তব্যের সত্যতা নিজে থেকে প্রতিষ্ঠা করে না। একইভাবে, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মতভেদ থাকলেও উত্থাপিত তথ্যগত প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। প্রতিটি দাবির মূল্যায়ন করতে হবে সংশ্লিষ্ট দলিল, প্রমাণ এবং বিকল্প ব্যাখ্যার ভিত্তিতে।

রুবিনের মূল প্রশ্ন হলো: জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহতের অনুমানের পক্ষে কী ধরনের তথ্য রয়েছে এবং সেই তথ্য কতটা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য? এর সঙ্গে তাঁর আরেকটি রাজনৈতিক দাবি যুক্ত হয়েছে—প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম প্রশ্নটি পদ্ধতিগতভাবে যাচাই করা সম্ভব; দ্বিতীয়টি মূল্যায়নের জন্য প্রতিবেদনটির বাস্তব ব্যবহার, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে।

জাতিসংঘের মূল প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?

OHCHR ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে Human Rights Violations and Abuses related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh শিরোনামে একটি তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদনটি বিভিন্ন বিশ্বাসযোগ্য উৎসে পাওয়া মৃত্যুর তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করে যে এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারেন। এতে বলা হয়, নিহতদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়ে থাকতে পারেন। হাজার হাজার মানুষ আহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি প্রতিটি মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি কিংবা প্রতিটি ঘটনার জন্য পৃথকভাবে অপরাধীর পরিচয় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠার যেহেতু সমতুল্য নয়।সেহেতু এর ব্যবহার করে দন্ড প্রদান কতটা যৌক্তিক?

প্রতিবেদনটির পদ্ধতিগত ভিত্তি হিসেবে OHCHR জানিয়েছে, তদন্তে ২৩০টির বেশি গোপনীয় গভীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। আরও ৩৬ জন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ১১টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ফরেনসিক চিকিৎসক চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করেন, ২৯ জনের পরীক্ষা করেন এবং সম্মতিসাপেক্ষে ১৫৩টি চিকিৎসা-নথি পর্যালোচনা করেন। অস্ত্রবিশেষজ্ঞ ভিডিও, ছবি ও গোলাবারুদের অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ করেন। তদন্তকারী দল মূল ভিডিও ও ছবি সংরক্ষণ ও পর্যালোচনা করে।

জাতিসংঘ একই সঙ্গে স্বীকার করেছে যে সময় ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনটি তাই একটি বিস্তৃত তথ্য-অনুসন্ধানমূলক মূল্যায়ন, প্রতিটি মৃত্যুর সম্পূর্ণ জাতীয় রেজিস্টার নয়।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরন, সম্ভাব্য দায় এবং ব্যবস্থাগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ, প্রযোজ্য আইনি উপাদান এবং বিচারিক মানদণ্ড পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হয়।

মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ: প্রমাণের মানদণ্ড

বাংলাদেশের জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হলো—মৃত্যুর ঘটনা, বেআইনি বলপ্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় তিনটি সম্পর্কিত হলেও স্বতন্ত্র প্রশ্ন।

কোনো ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন—এটি চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু সেই মৃত্যু আইনবহির্ভূত ছিল কি না, তা নির্ধারণে ঘটনার পরিস্থিতি, অস্ত্র ব্যবহারের উদ্দেশ্য, তাৎক্ষণিক বিপদের প্রকৃতি, বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতা পরীক্ষা করতে হবে। একইভাবে, কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা সরাসরি গুলি চালিয়েছেন, নির্দেশ দিয়েছেন, অপরাধ সম্পর্কে জেনেও তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা পরবর্তী তদন্ত বাধাগ্রস্ত করেছেন কি না—এসব প্রশ্নের জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং আনুপাতিক হতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল অত্যন্ত কঠোর পরিস্থিতিতে, বিশেষত জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য হলে, গ্রহণযোগ্য হতে পারে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণ বা কেবল আইন অমান্য করা নিজে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না।

সুতরাং, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত মৃত্যুর সংখ্যা যাচাই করার পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বলপ্রয়োগের বৈধতা মূল্যায়ন করাও জরুরি।

আন্তর্জাতিক মানে প্রাণহানি অনুসন্ধানের আটটি কারিগরি ধাপ

একটি বিশ্বাসযোগ্য মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরির জন্য অন্তত আটটি অনুসন্ধান-পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।

১. সাক্ষ্য সংগ্রহ ও যাচাই: প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের স্বজন, আহত ব্যক্তি, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, অন্যের কাছ থেকে শোনা তথ্য এবং পরে দেখা ভিডিওর ভিত্তিতে দেওয়া বক্তব্য পৃথকভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে।

২. নিহতের পরিচয় ও মৃত্যুর সংখ্যা নির্ধারণ: নাম, বয়স, মৃত্যুর সময় ও স্থান, হাসপাতালের নথি, মৃত্যুসনদ, ময়নাতদন্ত এবং পরিবারের সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। নামের বানানভেদ ও পুনরাবৃত্ত রেকর্ড বাদ দিতে হবে। অশনাক্ত মৃতদেহ পৃথকভাবে নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন।

৩. চিকিৎসা ও ফরেনসিক পরীক্ষা: ক্ষতের ধরন, গুলির প্রবেশ ও নির্গমনপথ, এক্স-রে, উদ্ধারকৃত বুলেট বা ধাতব খণ্ড এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় পরীক্ষা করতে হবে। শুধু ক্ষত দেখে অস্ত্রের নির্দিষ্ট মডেল বা গুলিকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না।

৪. ভিডিও ও ডিজিটাল ফরেনসিক: মূল ফাইল, মেটাডেটা, ধারণের সময় ও স্থান, ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ এবং সম্পাদনার সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সময়কে ভিডিও ধারণের সময় ধরে নেওয়া যাবে না।

৫. অস্ত্র ও ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ: কার্তুজের খোসা, গুলির দিক, সম্ভাব্য গুলিবর্ষণের স্থান, অস্ত্র-ইস্যুর রেজিস্টার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েনের তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে। কোনো অস্ত্রের সঙ্গে গুলির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও কে কখন সেটি ব্যবহার করেছেন, তা প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন।

৬. স্বাধীন উৎসের পারস্পরিক সমর্থন: সাক্ষ্য, চিকিৎসা-নথি, ভিডিও, অস্ত্রবিশ্লেষণ ও সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখতে হবে। একই মূল ভিডিও থেকে তৈরি একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনকে একাধিক স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে গণনা করা উচিত নয়।

৭. কমান্ড কাঠামো ও দায়িত্ব নির্ধারণ: অভিযান-আদেশ, ডিউটি রোস্টার, অস্ত্র বিতরণ রেজিস্টার, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণে তাঁর কার্যকর কর্তৃত্ব, জ্ঞান, নির্দেশ এবং অপরাধ প্রতিরোধ বা শাস্তির বিষয়ে ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।

৮. প্রমাণ সংরক্ষণ ও স্বাধীন পুনঃপরীক্ষা: প্রতিটি প্রমাণের উৎস, সংগ্রহের সময়, সংগ্রহকারী, হস্তান্তর ও সংরক্ষণের ইতিহাস নথিবদ্ধ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতাকে *Chain of Custody* বলা হয়। মূল ফাইল অক্ষত রাখা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

এসব নীতি জাতিসংঘের Minnesota Protocol on the Investigation of Potentially Unlawful Death (2016)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন কীভাবে স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা যেতে পারে?

জাতিসংঘের অনুমান, সরকারি গেজেটের তালিকা এবং ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে উদ্ধৃত সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরসনে একটি স্বচ্ছ তুলনামূলক নিরীক্ষা প্রয়োজন। এ নিরীক্ষায় পাঁচটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

প্রথমত, মৃত্যুর হিসাব পুনর্গঠন করতে হবে। নামভিত্তিক তালিকা, হাসপাতালের তথ্য, মৃত্যুসনদ, ময়নাতদন্ত এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎসের ভিত্তিতে একই সময়সীমার একটি সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অনুসন্ধানের পরিধি নির্ধারণ করতে হবে। কোন জেলা, হাসপাতাল, ঘটনা ও সাক্ষী তদন্তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং কোনগুলো বাদ পড়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। নমুনাভিত্তিক অনুসন্ধানকে সম্পূর্ণ জাতীয় গণনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

তৃতীয়ত, মৃত্যুর কারণ ও দায়ের পার্থক্য বজায় রাখতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্রে মৃত্যু হওয়া এবং নির্দিষ্ট কর্মকর্তার অপরাধমূলক দায় প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

চতুর্থত, বিপরীত তথ্য ও বিকল্প ব্যাখ্যা পরীক্ষা করতে হবে। সরকারি বক্তব্য, আত্মরক্ষার দাবি, সাক্ষ্যবিরোধ, অসম্পূর্ণ ভিডিও এবং তথ্যের ঘাটতি ন্যায্যভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, পুনরুৎপাদনযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। যথাযথ গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রেখে অন্য স্বাধীন তদন্তকারী যেন একই নথি, পদ্ধতি এবং যাচাইয়ের নিয়ম ব্যবহার করে সিদ্ধান্তের যুক্তি পরীক্ষা করতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকা উচিত।

এই নিরীক্ষার উদ্দেশ্য কোনো পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে আগাম বৈধতা দেওয়া নয়। বরং প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুর সংখ্যা, ঘটনার প্রকৃতি এবং দায় নির্ধারণকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করা।

রাজনৈতিক বয়ান, অপতথ্য ও বাস্তব মানবাধিকার লঙ্ঘন

রুবিনের বক্তব্য মূল্যায়নে দুটি প্রশ্ন পৃথক রাখা প্রয়োজন। প্রথমটি হলো, আন্দোলনের সময় ভুল তথ্য, অপতথ্য বা রাজনৈতিক প্রচার জনমতকে প্রভাবিত করেছে কি না। দ্বিতীয়টি হলো, আন্দোলনের সময় বাস্তবে কতজন নিহত হয়েছেন, কী ধরনের বলপ্রয়োগ ঘটেছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য কারা দায়ী।

কোনো আন্দোলনে অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ থাকলেও তা আন্দোলনের পেছনে থাকা বাস্তব অসন্তোষ বা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রমাণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না। একইভাবে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও আন্দোলনের প্রতিটি দাবি, প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা পরবর্তী সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে যাচাই ছাড়াই সঠিক বলা যায় না।

বাংলাদেশের জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ক্ষেত্রে চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু করে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষ, নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগ, প্রাণহানি এবং সরকার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পৃথকভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, পুলিশ ও অন্যান্য ব্যক্তির মৃত্যু এবং অন্যান্য সহিংসতার অভিযোগও একই নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।

কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় তার বক্তব্যকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না। নির্ভরযোগ্য প্রমাণই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

উপসংহার: সত্য নির্ধারণে প্রমাণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

মাইকেল রুবিনের নিবন্ধ এবং শেখ হাসিনার পক্ষে আইনজীবীর চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর প্রাণহানি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: জাতিসংঘের সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহতের অনুমানের পক্ষে কী তথ্য রয়েছে এবং সেই অনুমান কতটা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। জাতিসংঘের প্রতিবেদন একটি বিস্তৃত তথ্য-অনুসন্ধানমূলক কাজের ফল, যেখানে সাক্ষাৎকার, চিকিৎসা-নথি, ভিডিও, ছবি ও অস্ত্রবিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মৃত্যুর তালিকা নয় এবং তদন্তের পরিধি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আইনজীবীর আপত্তি ও রুবিনের সমালোচনাও তাই প্রমাণভিত্তিক নিরীক্ষার বিষয়; এগুলো নিজেরাই জাতিসংঘের হিসাব ভুল প্রমাণ করে না।

বাংলাদেশের মানবাধিকার অনুসন্ধানে তিনটি প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে: -কী ঘটেছিল, কোন ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে এবং কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের কী ধরনের দায়ের প্রশ্ন ওঠে।** এই তিনটি স্তর এক করে ফেললে পরিসংখ্যানগত অনুমানকে ফৌজদারি দায়ের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

অতএব, প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তুলনামূলক নিরীক্ষা, যেখানে নামভিত্তিক তথ্য, মৃত্যুর কারণ, সময় ও স্থান, প্রমাণের উৎস, বিপরীত সাক্ষ্য এবং অনিশ্চয়তার সীমা স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হবে। এমন প্রক্রিয়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করার পাশাপাশি নিহতদের মর্যাদা, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের অধিকার এবং অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচারের অধিকারও সুরক্ষিত করতে পারে।

মানবাধিকার প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল তার প্রকাশক প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না; তা নির্ভর করে পদ্ধতির স্বচ্ছতা, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা, স্বাধীন যাচাই, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্তের সঙ্গে উপস্থাপিত প্রমাণের সামঞ্জস্যের ওপর। বাংলাদেশের জন্যও ন্যায়বিচার ও ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার পথ হওয়া উচিত—রাজনৈতিক দাবি নয়, যাচাইযোগ্য প্রমাণ ও জবাবদিহি।

লেখকঃ কানাডা প্রবাসী মুক্তিযুদ্ধা, গবেষক, সাংবাদিক ও  রাজনৈতিক বিশ্লেষক
 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন