কাজল রশীদ ||
মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব একটি অমূল্য সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্কের বাইরে এমন একটি বন্ধন, যেখানে বিশ্বাস, আন্তরিকতা, সহযোগিতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনের একটি কঠিন সত্য হলো, অনেক সময় সবচেয়ে কাছের বন্ধুই সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। একজন মানুষের সাফল্য যত বেশি দৃশ্যমান হয়, ততই তার আশেপাশের কিছু মানুষের মনে অদৃশ্য এক অস্বস্তি জন্ম নিতে থাকে। এই অস্বস্তিই ধীরে ধীরে হিংসায় রূপ নেয়। আর সেই হিংসা যদি কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মনে জন্ম নেয়, তবে তার কষ্ট সবচেয়ে গভীর হয়।
বন্ধুর হিংসা কখনো হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা তুলনা, অপূর্ণতা এবং আত্মঅসন্তুষ্টির ফল। যখন দুই বন্ধু একই পথের পথিক হয়, একই স্বপ্ন দেখে এবং একই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে, তখন একজনের সাফল্য অন্যজনের কাছে নিজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। সে তখন বন্ধুর অর্জনকে আনন্দের চোখে না দেখে নিজের অপূর্ণতার আয়নায় দেখতে শুরু করে।
ধরা যাক, দুই বন্ধু কবিতা লিখে। একজনের লেখা পাঠকের প্রশংসা পাচ্ছে, বই প্রকাশিত হচ্ছে, সাহিত্য সভায় সম্মানিত হচ্ছে। অন্যজন হয়তো একই রকম চেষ্টা করেও সেই স্বীকৃতি পাচ্ছে না। তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে, কেন সে নয়, কেন তার বন্ধু? এই প্রশ্নের উত্তর যদি সে নিজের ভেতরে খুঁজে না পায়, তবে তার মনে হিংসার বীজ জন্ম নেয়। সে বন্ধুর সাফল্যের প্রশংসা করার পরিবর্তে ত্রুটি খুঁজতে শুরু করে।
একই ঘটনা রাজনীতি কিংবা সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রেও ঘটে। দুই বন্ধু যদি একই আদর্শ নিয়ে পথচলা শুরু করে এবং একজন বড় দায়িত্ব বা নেতৃত্বের আসনে পৌঁছে যায়, তখন অন্যজনের মনে অজান্তেই প্রতিযোগিতার অনুভূতি তৈরি হয়। সে ভাবতে শুরু করে, এই সম্মান তারও প্রাপ্য ছিল। এই ভাবনা থেকেই বন্ধুর প্রতি দূরত্ব এবং ঈর্ষার জন্ম হয়।
পেশাগত জীবনেও এই বাস্তবতা স্পষ্ট। দুই বন্ধু যদি চিকিৎসক হয়, প্রকৌশলী হয় কিংবা ব্যবসায়ী হয়, তাহলে একজনের প্রতিষ্ঠা অন্যজনের মনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একজনের হাসপাতাল বা চেম্বারে রোগীর ভিড়, একজনের প্রতিষ্ঠানে ব্যবসার সফলতা কিংবা একজনের সামাজিক পরিচিতি অন্যজনের মনে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। কারণ মানুষ সাধারণত নিজের অবস্থানকে সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করে অন্যের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করে।
হিংসার সবচেয়ে বড় কারণ হলো তুলনা। মানুষ যখন নিজের অর্জনকে নিজের গতিতে বিচার না করে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে মেলাতে শুরু করে, তখন তার ভেতরের শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না যে প্রত্যেক মানুষের পথ, সময় এবং ভাগ্য আলাদা। ফলে বন্ধুর সাফল্য তাকে অনুপ্রাণিত করার পরিবর্তে কষ্ট দিতে শুরু করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা। প্রত্যেক মানুষ চায় তাকে সম্মান করা হোক, তার কাজের মূল্যায়ন হোক। কিন্তু যখন সে দেখে তার কাছের বন্ধু সেই সম্মান পাচ্ছে আর সে পাচ্ছে না, তখন তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। এই আঘাত যদি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে না পারে, তবে তা ধীরে ধীরে হিংসায় পরিণত হয়।
মানুষের অহংবোধও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। অনেকেই মনে করে, সে অন্যদের চেয়ে বেশি যোগ্য। কিন্তু বাস্তবে যখন অন্য কেউ এগিয়ে যায়, তখন তার অহংকার ভেঙে যায়। এই ভাঙনের যন্ত্রণা অনেকেই মেনে নিতে পারে না। ফলে বন্ধুর সাফল্যকে ছোট করে দেখা, সমালোচনা করা কিংবা তার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলা শুরু করে।
বন্ধুর হিংসা সব সময় প্রকাশ্যে দেখা যায় না। অনেক সময় এটি গোপন আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আগে যে বন্ধু প্রতিটি সাফল্যে অভিনন্দন জানাত, সে ধীরে ধীরে চুপ করে যায়। প্রয়োজন ছাড়া যোগাযোগ করে না। অন্যের সামনে প্রশংসা করার বদলে সমালোচনার সুযোগ খোঁজে। আবার কখনো বন্ধুর ভুলকে বড় করে দেখায়, কিন্তু তার ভালো কাজগুলোকে গুরুত্ব দিতে চায় না। এসব আচরণই আড়ালে লুকিয়ে থাকা হিংসার লক্ষণ।
তবে সব বন্ধু যে এমন হবে, তা নয়। প্রকৃত বন্ধু কখনো বন্ধুর সাফল্যে কষ্ট পায় না। বরং সে গর্ব অনুভব করে। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্ব প্রতিযোগিতার নয়, সহযোগিতার। প্রকৃত বন্ধু জানে, অন্যের সাফল্য তার নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে পরিশ্রম করলে সফল হওয়া সম্ভব।
হিংসা থেকে মুক্ত থাকার সবচেয়ে বড় উপায় হলো আত্মউন্নয়নের পথে চলা। অন্যের জীবন নয়, নিজের জীবনের দিকে মনোযোগ দেওয়া। প্রতিদিন নিজেকে আগের দিনের চেয়ে একটু ভালো করার চেষ্টা করা। অন্যের অর্জনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে নয়, অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা। তাহলে বন্ধুত্বও টিকে থাকবে এবং নিজের মানসিক শান্তিও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
জীবনের বাস্তবতা হলো, সাফল্য যেমন মানুষের পরিচিতি বাড়ায়, তেমনি মানুষের প্রকৃত চরিত্রও প্রকাশ করে। কেউ আপনার সাফল্যে আনন্দিত হবে, আবার কেউ মনে মনে কষ্ট পাবে। তাই সবার মন জয় করার চেষ্টা না করে নিজের সততা, পরিশ্রম এবং মানবিকতা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় কাজ। কারণ সাময়িক হিংসা একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সুন্দর চরিত্র এবং ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।
বন্ধুত্বের আসল সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন একজনের সাফল্যে অন্যজন আন্তরিকভাবে হাসতে পারে। যে বন্ধু আপনার উন্নতিতে আনন্দ পায়, আপনার ব্যর্থতায় পাশে দাঁড়ায় এবং আপনার অগ্রগতিকে নিজের গর্ব বলে মনে করে, সেই বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। আর যে বন্ধু আপনার আলো সহ্য করতে পারে না, সে হয়তো পরিচিত মানুষ হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন