ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : ইস্তিগফার মানুষের জীবনে খুলে দেয় প্রশান্তি ও বরকতের দরজা

 

শায়খ আনিসুল হক ||

নিয়মিত আল্লাহ'র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফারকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম শায়খ আনিসুল হক । তিনি বলেন, ইস্তিগফার মানুষের জীবনে আত্মিক প্রশান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম । সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে কিংবা সংকটে সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

২৩ অক্টোবর ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় শায়খ আনিসুল হক আরো বলেন, মানুষ জীবনের অধিকাংশ সময় ধনসম্পদ, সফলতা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের পেছনে ব্যয় করে । অথচ পরকালে প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনবে এমন আমলের প্রতি অনেকেই যথাযথ গুরুত্ব দেন না।

তিনি ইসলামের ন্যায়পরায়ণ শাসক উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। বর্ণিত আছে, তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে আবদুল আজিজ স্বপ্নে বাবাকে একটি বাগানে দেখতে পান । এ সময় তিনি জানতে চান, কোন আমলটি তাঁর জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী হয়েছে? জবাবে উমর ইবনে আবদুল আজিজ বলেন, ‘হে আমার পুত্র, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।’

শায়খ আনিসুল হক বলেন, ইস্তিগফারের জন্য অর্থসম্পদ, সামাজিক অবস্থান কিংবা বিশেষ কোনো স্থান ও সময়ের প্রয়োজন হয় না। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে, যাতায়াতের সময় কিংবা ঘুমানোর আগে যেকোনো মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়।

তিনি বলেন, একজন মুমিনের জীবনে দুটি বিষয় সর্বদা গুরুত্ব পাওয়া উচিত । একটি হলো আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অন্যটি নিজের ভুলত্রুটি ও গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা।

এ প্রসঙ্গে তিনি বিখ্যাত ইসলামী মনীষী হাসান আল-বসরি (রহ.)-এর সঙ্গে একজন মালবাহকের একটি ঘটনা তুলে ধরেন। ঘটনায় বলা হয়, ওই মালবাহক পথ চলতে চলতে বারবার দুটি বাক্য উচ্চারণ করছিলেন—‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’।

এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো তাঁর দেওয়া নিয়ামত, যার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা প্রয়োজন। অন্যটি হলো তাঁর প্রতি আমার দায়িত্ব পালনে ত্রুটি, যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন।’

শায়খ আনিসুল হক বলেন, এই সাধারণ কথার মধ্যেই রয়েছে গভীর শিক্ষা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা হয় আল্লাহর কোনো নিয়ামত ভোগ করছি, যার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রয়োজন; নয়তো কোনো না কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছি, যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা প্রয়োজন।

ইস্তিগফারের মাধ্যমে রিজিক ও বরকত বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি পবিত্র কুরআনের সুরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন । এসব আয়াতে নবী নুহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে বৃষ্টি, ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি, বাগান ও নদ-নদীর নিয়ামতের কথা তুলে ধরেছিলেন।

শায়খ আনিসুল হক বলেন, আর্থিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তায় পড়লে মানুষের উচিত আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইস্তিগফার করলেই জীবনের সব সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে দূর হয়ে যাবে, এমন নয় । আল্লাহর নবী-রাসুলরাও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক মানুষকে কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য, মানসিক প্রশান্তি ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয় ।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন একশ'বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত ইস্তিগফারকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা।

শায়খ আনিসুল হক আন্তরিক ইস্তিগফারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। এগুলো হলো বিনয়, ভুল স্বীকার এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা।

তিনি বলেন, বিনয় মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের সব অর্জন ও সফলতা আল্লাহর দান । ভুল স্বীকারের অর্থ হলো অজুহাত না দেখিয়ে নিজের অন্যায় ও ত্রুটির দায়িত্ব গ্রহণ করা। আর আশা হলো অতীতের গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর অসীম রহমত থেকে কখনো নিরাশ না হওয়া।

যাঁরা বারবার একই ভুলে জড়িয়ে পড়েন, তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আন্তরিক অনুতাপ ও নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপারে হতাশ হওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, ‘আপনি গতকালকে পরিবর্তন করতে পারবেন না, কিন্তু আজ কী করবেন, তা পরিবর্তন করতে পারেন । আপনার পরবর্তী নামাজ থেকেই শুরু করুন এবং আন্তরিকভাবে আস্তাগফিরুল্লাহ বলুন।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে শায়খ আনিসুল হক বলেন, ইস্তিগফার যেন কেবল মুখে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এর মাধ্যমে নিজের ভুল উপলব্ধি, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর ক্ষমার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে তিনি মহান আল্লাহর কাছে সবার জন্য ইবাদতে বিনয়, তওবায় আন্তরিকতা, গুনাহের ক্ষমা এবং তাঁর রহমতের প্রতি অবিচল আস্থা কামনা করেন।

শায়খ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার, জুমার খুতবা  ২৩ অক্টোবর ২০২৩।।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন