আদালতকক্ষে ঢোকার আগেই শোনা যায় শিকলের ঝনঝন শব্দ। পাঁচজন বন্দিকে আদালতে আনা হচ্ছে।
তার পায়ের গোড়ালিতে বাঁধা শিকল প্রতিটি পদক্ষেপে শব্দ করছে। আদালতে আসা-যাওয়া এখন তাদের কাছে পরিচিত ঘটনা। বিবিসি জানায়, একাধিক ফৌজদারি মামলার কারণে গত পাঁচ বছরের বেশির ভাগ সময় তাদের আদালতেই কাটাতে হয়েছে।
বন্দিদের একজন অর্ণন নামপা।
তার বয়স ৪২ বছর। মাথার চুলে পাক ধরেছে। চোখে চশমা। তিনি একজন মানবাধিকার আইনজীবী।
থাইল্যান্ডের ক্ষমতাধর রাজপরিবারের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
২০২০ সালে ব্যাংককের কেন্দ্রে হ্যারি পটারকে ঘিরে আয়োজিত একটি বিক্ষোভে তিনি এই দাবি তুলেছিলেন। সেদিন তার পরনে ছিল হ্যারি পটারের পোশাক। শুক্রবার ব্যাংককের একটি আদালত তাকে দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের অবমাননাসংক্রান্ত আইন ভাঙার দায়ে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়।
দেশটিতে এই আইন ১১২ ধারা নামে পরিচিত।
রাজপরিবারকে অপমানের অভিযোগে এই আইনে থাইল্যান্ডে বিপুলসংখ্যক মানুষকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই ধরনের আইন রয়েছে, এমন অন্য দেশগুলোতেও এভাবে এত মানুষকে সাজা দেওয়া হয়নি। অর্ননের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে মোট ১৪টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত তার কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩৪ বছর ছাড়িয়েছে। আরও দুটি মামলার রায় এখনো হয়নি। রায়ের পর সাংবাদিকদের অর্নন বলেন, ‘এতে আমি অবাক হইনি। দেশটি যদি আরো স্বাধীন হতো, তাহলে এসব বিষয় নিয়ে আমরা খোলাখুলি কথা বলতে পারতাম।’
গত ছয় বছরে থাইল্যান্ডে রাজপরিবারের অবমাননাসংক্রান্ত আইনটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২০ সালে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের বিক্ষোভের পর এর ব্যবহার বাড়ে। ওই বিক্ষোভে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে রাজপরিবারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার দাবি ওঠে। এরপর থেকে ২৯৪ জনের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ২০ জন। কারও কারও ৫০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হয়েছে। এখনো কয়েক ডজন মানুষের বিচার চলছে।
এই আইনে অভিযুক্ত বেশির ভাগ মানুষ জামিন পান না। বিচার শেষ হতে কয়েক বছর লেগে গেলেও তাদের কারাগারে থাকতে হয়। থাই কর্মকর্তারা সাধারণত এই আইনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এটি দেশটির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। তাদের মতে, রাজপরিবার থাইল্যান্ডের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির বেশির ভাগ মানুষ রাজপরিবারকে গভীর শ্রদ্ধা করেন। থাইল্যান্ডের ফৌজদারি আইনের ১১২ ধারায় বলা হয়েছে, রাজা, রানি, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বা রাজপ্রতিনিধির মানহানি, অপমান বা তাদের হুমকি দিলে তিন থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে বাস্তবে রাজপরিবার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যের ক্ষেত্রেও এই আইন ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি রাজপরিবারের কোনো সদস্য, রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান কিংবা বহু আগে মারা যাওয়া রাজাদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলেও মামলা হয়েছে। একবার রাজার পোষা কুকুরকে নিয়ে মন্তব্য করার কারণেও একজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এই আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেয় থাই লইয়ার্স ফর হিউম্যান রাইটস। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক আকারাচাই চাইমানিকারাকাতে বলেন, আইনে ‘মানহানি’ বা ‘অপমান’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
তিনি বলেন, ‘আইনের ভাষায় কী লেখা আছে, তা আমি বলতে পারব। কিন্তু আদালত এই শব্দগুলোর কী অর্থ করে, তা বলা কঠিন। কারণ, এর কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এমনকি এই আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও রাজপরিবারের অবমাননা হিসেবে দেখা হতে পারে।’ গত তিন বছর ধরে ব্যাংককের একটি রিমান্ড কারাগারে বন্দী রয়েছেন অর্নন। সেখান থেকেই তিনি তার ছোট মেয়ে ও ছেলেকে চিঠি লেখেন।
একটি চিঠিতে সন্তানদের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন,
‘প্রিয় প্রান ও কার্ল, আমার আদরের সন্তানেরা,
শীতের বাতাস শুধু ঠাণ্ডা নিয়ে আসে না, ফিরিয়ে আনে পুরনো স্মৃতিও। কার্লের জন্মের পর প্রথম শীতে আমরা ব্যাংককের বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেই সময়টা আমার কাছে জাদুর মতো সুন্দর ছিল। যত দিন এখানে থাকব, প্রতি শীতেই সেই স্মৃতি মনে পড়বে। মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত এই স্মৃতি আমাকে কষ্ট দেবে।’ কারাগারে থাকার কারণে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ খুব কম পান অর্ণন। আদালতের শুনানিই এখন তার ছেলের সঙ্গে দেখা করার অন্যতম সুযোগ।
শুক্রবারের রায়ের কয়েক সপ্তাহ আগে একটি শুনানিতে তিন বছরের ছেলে কার্লকে নিয়ে এসেছিলেন তার সঙ্গী লুকওয়া। প্রথমে বাবার কাছে যেতে কিছুটা লজ্জা পায় কার্ল। তবে কিছুক্ষণ পর বাবার কোলে ওঠে সে। পরে অর্নন অন্য বন্দীদের কাছেও ছেলেকে নিয়ে যান। অর্ননের ১০ বছর বয়সী মেয়ে প্রান মাঝেমধ্যে কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যায়। সে বাবার ছবি আঁকে এবং রং করে। তবে অর্নন ও তার সঙ্গী মনে করেন, কার্লের এখনো কারাগারে যাওয়ার বয়স হয়নি। আপাতত কার্লের ধারণা, আদালতই তার বাবার কর্মস্থল।
সেদিন আদালতে অর্ননের কয়েকজন সমর্থকও উপস্থিত ছিলেন। তাদের ভিড়ে ছোট আদালতকক্ষটি পূর্ণ হয়ে যায়। বিচারক আসার আগে তারা বন্দীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন। একে অন্যের খোঁজখবর নেন। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটির মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদালতের এমন স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী।
১১২ ধারার কারণে থাইল্যান্ডে রাজপরিবার নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছয় বছর আগেও মানুষ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতেন। ব্যক্তিগত পরিসরেও অনেকে ফিসফিস করে কথা বলতেন। একবার এক ট্যাক্সিচালককে কারাগারে পাঠানো হয়। তার গাড়িতে ওঠা এক যাত্রী রাজপরিবার নিয়ে চালকের একটি মন্তব্য কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে সাজা দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২০ সালের ৩ আগস্ট।
সে সময় থাইল্যান্ডের তরুণদের মধ্যে রক্ষণশীল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছিল। সরকারটির নেতৃত্বে ছিলেন সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জেনারেল প্রায়ুত চান-ওচা। এর আগের বছর লাখ লাখ মানুষ ফিউচার ফরোয়ার্ড নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়েছিলেন। দলটি বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির সাংবিধানিক আদালত একটি কারিগরি কারণ দেখিয়ে দলটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
এরপর করোনাভাইরাসের কারণে তিন মাস কোনো বিক্ষোভ হয়নি। সংক্রমণ কমে এলে শিক্ষার্থীরা আবার রাস্তায় নামেন। তারা রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বন্ধের দাবি জানান। কিন্তু অর্নন নামপার মনে হয়েছিল, শুধু এই দাবি যথেষ্ট নয়। হ্যারি পটারের পোশাক পরে এক বিক্ষোভে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে রাজপরিবারের ক্ষমতা ও বিপুল সম্পদ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার আহ্বান জানান। রাজা ভাজিরালংকর্নের দুটি সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন অর্নন। এর একটি ছিল রাজপরিবারের সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে থাকা সংস্থার বিপুল সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। অন্যটি ছিল সেনাবাহিনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া।
অর্ননের ওই বক্তব্য থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের একটি নিষেধাজ্ঞা ভাঙার পথ তৈরি করে। এরপর ওই বছরের বাকি সময়জুড়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলতে থাকে। রাজপরিবারের সংস্কারের দাবিও জোরালো হয়। এর আগে টানা তিন বছর রাজপরিবারের অবমাননাসংক্রান্ত আইনটি ব্যবহার করা হয়নি। রাজপ্রাসাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোও আগে স্বীকার করেছিল, এই আইনে দোষী ব্যক্তিদের সাজা দেওয়ার খবর রাজপরিবারের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
কিন্তু বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ আবার এই আইনে মামলা শুরু করে। ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে মামলার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। কারাগারে যাওয়ার আশঙ্কায় কয়েক ডজন তরুণ আন্দোলনকারী দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন। এমনই একজন সুপিচা ‘মেলিন’ চাইলোম। তার বয়স ২৪ বছর। থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চিয়াং মাইয়ের বাসিন্দা তিনি। বর্তমানে কানাডার মন্ট্রিয়লে থাকেন। ১১২ ধারায় তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি থাইল্যান্ড ছেড়ে চলে যান।
অর্নন নামপা রাজপরিবারের সংস্কারের দাবি তোলার তিন সপ্তাহ পর চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিক্ষোভে বক্তব্য দিয়েছিলেন মেলিন। তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। একজন আলোকচিত্রী সেই সময়ের একটি ছবি তোলেন। ছবিতে দেখা যায়, মেলিন হাত তুলে তিন আঙুলের একটি বিশেষ ভঙ্গি দেখাচ্ছেন। এই ভঙ্গি ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’ চলচ্চিত্রে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তার এই ভঙ্গি দেখে বিক্ষোভকারীরা উল্লাস করেন।
ছবিটি আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে সারা দেশে পরিচিতি পান মেলিন। পরে তিনি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানান। রাজপরিবার সম্পর্কে মানুষের মতামত জানতে জনমত জরিপও করেন। কানাডা থেকে মেলিন বলেন, ‘আমি খেলতে খুব ভালোবাসি। আমার স্বপ্ন ছিল গেম ডিজাইনার হওয়ার। কিন্তু আমার বাবা-মা এতে রাজি ছিলেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হতো, একজন তরুণ হিসেবে আমি কোনো প্রশ্ন করতে পারি না। বয়সে বড় মানুষের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও ছিল না। রাজপরিবারের ক্ষেত্রেও আমার একই রকম মনে হতো।’ ২০২০ সালের নভেম্বরে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হাত ইয়াইয়ের একটি বিক্ষোভে অংশ নেন মেলিন। সেখানে তিনি রাজার পোষা কুকুরকে দেওয়া বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতি আচরণের তুলনা করে বক্তব্য দেন। এর নয় মাস পর পুলিশ তার বাড়িতে একটি সমন নিয়ে যায়। এতে তাকে রাজপরিবারের অবমাননার অভিযোগে হাজির হতে বলা হয়।
মেলিন বলেন, ‘এটা আমার জন্য বড় ধাক্কা ছিল। আমি এমন কিছু আশা করিনি। কারণ, আমি শুধু কুকুরটিকে নিয়ে কথা বলেছিলাম। করোনার সময় পুলিশ যখন আমাদের বাড়িতে সমন নিয়ে আসে, তখন তারা জানত আমার বাবা-মা বাড়িতে থাকবেন। তারা শান্ত থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না।’ মেলিনের পরিবার তাকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে বলেছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি।
পরে তিনি থালু ওয়াং নামের একটি আন্দোলনে যোগ দেন। নামটির অর্থ ‘রাজপ্রাসাদের দেয়াল ভেদ করে এগিয়ে যাওয়া’। এই আন্দোলনের সদস্যরা শুধু বক্তব্য দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে জনমত জরিপ করতেন। রাজপরিবারের গাড়িবহরের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে মানুষের মতামত জানতে চাইতেন। রাজপরিবারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করতেন। মেলিন বলেন, ‘আমরা জানতাম, এতে ঝুঁকি আছে। তবে আমাদের মনে হয়েছিল, শুধু জনমত জরিপ করলে হয়তো নিরাপদ থাকব। পরে বুঝলাম, সেটিও নিরাপদ নয়।’
২০২২ সালে মেলিনের বিরুদ্ধে রাজপরিবারের অবমাননার আরও দুটি অভিযোগ আনা হয়। তাকে আটক করা হলেও পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তার গোড়ালিতে ইলেকট্রনিক নজরদারির যন্ত্র পরিয়ে দেওয়া হয়। বিকেল ৪টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। তার বাবা-মাকে একটি নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। এতে মেলিনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয় তাঁদের। এভাবে তার সামনে কয়েক দশক কারাগারে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মেলিন। এক বন্ধুর সঙ্গে থাইল্যান্ড থেকে পালিয়ে কানাডায় আশ্রয় নেন তিনি।
থাইল্যান্ডের ১১২ ধারা দেশটির সংসদে পাস হওয়া একটি আইন। তাত্ত্বিকভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এটি সংশোধন করতে পারেন। অতীতেও এই আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে আইন ভাঙার শাস্তি বাড়িয়ে তিন থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড করা হয়। কিন্তু বর্তমানে দেশটির সাংবিধানিক আদালত জানিয়েছে, এই আইন এবং রাজতন্ত্র নিয়ে কোনো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না। ফিউচার ফরোয়ার্ডের উত্তরসূরি সংস্কারপন্থী দল মুভ ফরোয়ার্ডকে ২০২৪ সালে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। দলটির নেতাকেও রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর কারণ ছিল, দলটি ১১২ ধারার শাস্তি কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
এ ছাড়া এই আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আদালতে নিজেদের পক্ষে লড়াই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আইনজীবী আকারাচাই চাইমানিকারাকাতে বলেন, অর্নন নামপার মামলাসহ অনেক ক্ষেত্রে সরকারি আইনজীবীরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজপরিবার সম্পর্কে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনেন। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য সত্য কি না, তা প্রমাণের জন্য নথি বা সাক্ষী হাজির করতে চাইলে বিচারকেরা অনুমতি দেন না। তিনি আরো বলেন, একবার একজন আইনজীবী আপত্তি জানিয়েছিলেন। কারণ, আদালত বিচারকাজ গোপনে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন বিচারক তাকে চুপ থাকতে বলেন। অন্যথায় আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে বলে সতর্ক করেন।
চাইমানিকারাকাতে জানান, কখনো কখনো বিচার শুরু হওয়ার আগেই বিচারকেরা তরুণ আন্দোলনকারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন। রাজপরিবারের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে অর্নন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। এ কারণে তাকে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও প্রতিটি শুনানির জন্য প্রস্তুতি নেন অর্নন। নিজের মামলায় নিজেই আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। অন্য বন্দীদেরও তাদের মামলা পরিচালনায় সাহায্য করেন। তবে আদালতে নিজের হাতে লেখা কোনো নোট নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পান না তিনি। ফলে নিজের সব যুক্তি তাকে মুখস্থ রাখতে হয়।
কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী তাকে বাদামি রঙের হাফপ্যান্ট পরতে হয়। পায়ে জুতা থাকে না। গোড়ালিতে বাধা থাকে শিকল। এমন অবস্থায় আইনজীবীর ভূমিকা পালন করায় বিচারকেরা আপত্তি জানান। তবে আদালতে আসার সুযোগে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের আরেকটি উপায় হলো চিঠি লেখা। অর্নন আশঙ্কা করেন, জীবনের বাকি সময় তাকে কারাগারেই কাটাতে হতে পারে। তাই সন্তানদের কাছে নিজের জীবন ও বিশ্বাসের কথা জানাতে চান তিনি। বড় হয়ে যেন তারা বুঝতে পারে, কেন তিনি প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন এবং কেন এর জন্য নিজের স্বাধীনতা হারিয়েছেন।
গত বছর সন্তানদের লেখা এক চিঠিতে অর্ণন বলেন, ‘যেদিন প্রথম এই দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেদিন থেকেই আমরা বিপদের কথা জানতাম। সত্য বলা কঠিন নয়। কঠিন হলো এমন সত্য বলা, যা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। ২০২০ সালের ৩ আগস্ট সন্ধ্যার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। হ্যারি পটারের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার পর আমার খুব ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল, অবশেষে প্রকাশ্যে সত্য কথা বলতে পেরেছি।’
চলতি বছরের শুরুর দিকে আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘এখানে বেঁচে থাকাটাই এক ধরনের সংগ্রাম। তবে আমাদের বৃহত্তর আন্দোলনের তুলনায় এটি খুব ছোট একটি অংশ। নিজেদের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে আমাদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। পানির এক ফোঁটা হতে হবে, যা একদিন বিশাল সমুদ্রে পরিণত হবে।’
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন