রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক। |
আপনি কি কখনও ভুল ঠিকানায় কিছু প্রেরণ করেন? এই ধরুন, চিঠি কিংবা উপহার। ডাকে, কুরিয়ারে কিংবা হাতে হাতে? ঠিকানায় আপনার ভুল হয় না অথচ আপনি ভাবছেন, রব আপনার ঠিকানায় ভুল করে কিছু পাঠিয়েছে? আপনার রিজিক তিনি আপনাকে মোটেও ভুল করে দেননি! রিজিক বলতে আবার শুধু দুপুর কিংবা রাতের খাবারকে ভাবেন নাকি? আপনার জীবনে থাকা সুখ-শান্তি, দুঃখ-কষ্টও আপনার রিজিক। আপনার সুস্বাস্থ্য কিংবা অসুস্থতাও আপনার রিজিক। আপনার সঙ্গে থাকা মানুষটিও আপনার রিজিকের একটা বড় অংশ।
বিশ্বস্ত বন্ধু, ভরসার হাত কিংবা অর্থ-কড়ি- আপনার গোটা জীবনের রিজিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ। তিনি আপনাকে যা-কিছু দিলেন- তা নিয়ে আপনি সফল হলেন, নাকি ব্যর্থ হলেন- তা তাঁর পরিকল্পনার বাইরে নয়। তিনি আপনাকে পরীক্ষায় ফেললেন, নিয়ম-নীতি জানিয়ে দিলেন এবং আপনাকে চেষ্টা করতে বললেন- অতঃপর আপনাকে ফলাফল দিলেন। আপনার নিয়ত, আপনার পরিশ্রম এবং রবের অনুগ্রহ- সবকিছুর সম্মিলিত রূপ- আপনি এখন যা। তবে বিশ্বাস রাখুন, তিনি আপনার প্রতি অবিচার করেননি। বরং আপনি বিবেকবান হলে প্রতি পদে পদে আপনার কৃতজ্ঞতাই প্রভুর প্রাপ্য।
মানুষ অল্পতেই হতাশ হয়। ভাগ্যকে দায় দেয়। স্রষ্টাকে দোষারোপ করে। অথচ মানুষের ধৈর্যশক্তি খুবই কম। স্থিরতা তো আরও কম। সে এখনই সবকিছু পেতে অস্থির হয়ে ওঠে। সে কেবল অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করে। যেটার প্রতি লোভ হয় সেটাই তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা করে। না পেলে হতাশ হয়, মুষড়ে পড়ে। নিজেকে ব্যর্থ, অপদার্থ ভাবে। অথচ মানুষ যা পেয়েছে তা নিয়ে কখনোই সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয় না। রবকে মন থেকে বলে না, আমি অকৃতি অধম ব’লেও তো কিছু কম করে দাওনি মোরে।যা দিয়েছ, তারি অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তো কিছু নাওনি।”
মানুষ সহজাতভাবেই তার চেয়ে নাজুক কিংবা অসহায়কে দেখে কৃতজ্ঞ হয় না বরং সামর্থ্যবানকে দেখে ঈর্ষাণ্বিত হয়। এবং এভাবেই সে হয়ে ওঠে রাজ্যের সবচেয়ে অসুখী প্রাণীপালের সদস্য। অথচ মানুষের সুখী হওয়ার, আনন্দে বাঁচার কতকিছুই তো তার নাগালে ছিল। সে চিনেছে কেবল সম্পদ। ইচ্ছাতে শুধুই সঞ্চ্য়। বুঝেছে আসলের বিপরীত। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সর্বত্র। বিবেচনা করেছে কম। এবং কীভাবে অন্যকে ঠকানো যায় সেটাতে হাত সিদ্ধহস্ত করেছে। মানুষ স্বেচ্ছায় সহজ জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এক্ষেত্রে লোভ এবং প্রতিহিংসা মানুষের মর্যাদাকে ধ্বংস করেছে। সে নিজেকে তুচ্ছ করে অর্জন করতে চেয়েছে আরও তুচ্ছাতি-তুচ্ছ কিছু!
যে যোগ্যতা নিয়ে জীবিকা আহরণ করি, যে সুস্থতা নিয়ে বেঁচে আছি- তা কম কীসে? খেয়ে-পরে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকা সৌভাগ্যবানদের পরিণতি। এজন্য চিত্ত কৃতজ্ঞতা দেখালে শুধু বর্তমানের জন্যই মানুষ চিরকৃতজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে। হাসপাতালের বারান্দায় সুস্থতার জন্য কত মানুষের হাহকার চলছে অথচ দিব্যি সুস্থ থেকেও সুচিন্তার মধ্যে নাই। নিঃসন্তান দম্পতিদের দুঃখ সন্তানের বাবা-মা কোনদিন অনুভব করতে পারে? মানুষ সহজেই ভুলে যায় তার অতীত এবং অস্বীকার করে বাস্তবতা। ভাবাবেগ দিয়ে পারি দিতে চায় জীবনতরী।
অন্যের অনিষ্টে কী করে নিজেকে জড়াতে পারি, দুর্বলকে কীভাবে আরও দমাতে পারি, অন্যায়ভাবে আরও সম্পদ কীভাবে বাড়াতে পারি কিংবা ক্ষমতা আরও কীভাবে ছড়াতে পারি- সেই ধ্যানে আছি। জ্ঞান ধরেছে পাপে। অন্য মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ চিন্তা নাই। নিজের জন্য সব আয়োজন- স্বার্থ, স্বার্থ এবং স্বার্থ। পরার্থ কোথায়? এমনকি নিজেকে এতোটাই জুলুমবাজ করেছি যে নিজের ওপর জুলুম করতেও কার্পণ্য করি না। নয়তো মানুষ জেনে-বুঝেও মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিতে জড়াতে পারে?
আমরা মিথ্যা বলতে ছাড়ি না। অন্যায়কে এড়িয়ে চলি না। যা-কিছু আমার স্বার্থের পক্ষে- তা রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠি। সত্যের বুকে ও পেঠে পদাঘাত করি। আমি আমার মতো কখনোই বাঁচতে চাই না, বাঁচতে চাই অন্যদের মতো! সেজন্য আমার আর ভালো থাকা হয় না। সমাজ যে অসুস্থদের অনুসরণ করার ট্রেন্ডে ভূগছে।
কেউ যদি কখনও জিজ্ঞেস করে, কেমন আছি? দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি ভালো আছি কিংবা এই-তো যাচ্ছে কোনোমতে। অথচ তখন আফ্রিকার ক্ষুধার্ত শিশু, ফিলিস্তিনের সন্তানহারা মা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। কোন নায়ক কেমন পোশাক পরিধান করেছে, কোন সহকর্মী কত সম্পদ গড়েছে কিংবা কোন নারী কতখানি গহনা পেয়েছে- সেসব থাকে হৃদয়ে।
অন্তর্জ্বালা আমাদেরকে ছাড়ে না। জীবনযাপন করি অন্যের গণ্ডিতে, ভাবনাচিন্তা করি অলীক। অথচ অল্পতে কত গল্প জমতে পারতো- সুখের গল্প- তা জমা করিনি। সঙ্গের মানুষটির সঙ্গী হইনি। কেবল ব্যস্ততার বাহানায় পুড়িয়ে ফেলেছি সময়। আজীবনে ভালো কোনো স্মৃতি ধারণ করিনি। কেবল পুষেছি অভাবের কথা, দেখিয়েছি হাহাকার, শুনিয়েছি হতাশার গল্প। বিনে সুঁতোয় সম্পর্কের মালা গাঁথবার চেষ্টা না করে লালন করেছি চির-অতৃপ্তি। অথচ আমার সুস্থ হাত-পা ছিল, শরীরে বল ছিল তাও অন্যের সম্পদে লোভ করেছি। আলস্যকে আলিঙ্গন করে শুয়ে-বসে, পরচর্চায় কাটিয়েছি প্রহর। পরিশ্রম করেছি খুব অল্পই। যখন দুঃখের কথা বলি, তখন মনে হয় এই দুনিয়ার তাবৎ দুঃখ আমার। অথচ সুখের কথা ততটা প্রবল করে বলতে পারি না।
অল্পে যারা তুষ্ট হয়েছে, স্রষ্টার পরিকল্পনায় যারা ভরসা রেখেছে- তারা সুখে আছে। সুখ কিন্তু প্রাসাদের উচ্চতা কিংবা আবাসনের চাকচিক্য দিয়ে মাপা যায় না। পোশাকের দাম দিয়েও শান্তি-স্বস্তি আন্দাজ করা যায় না। সুখ থাকে আত্মিক তৃপ্তিতে। সুখের আসল ঠিকানা কৃতজ্ঞতায়। সেজন্য চাই সহজ-সরল জীবন। যে যত বেশি কৃতজ্ঞ সে তত বেশি সুখী। ছোট্ট একটা জীবন- সেটাকে লোভে পুড়িয়ে, হতাশায় ডুবিয়ে লাভ কী? ভবিষ্যতের পাঁচ প্রজন্ম কী খাবে, কেমনে বাঁচবে সেই ভাবনা করে আমার লাভ আছে? যদি ন্যায়পথে সম্পদ হয় তাতে দোষ নেই। কিন্তু অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঝাঁপালাম কেন? রাতে ঘুমাতে পারি না, দিনে স্বস্তিতে থাকতে পারি না, কারো প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারি না- এই জীবনের আসলে মানে কী? সঞ্চয়ের নেশায় জীবনের স্বাদ হারিয়ে ফেলছি নাতো?
কোনো অন্যায় বিনিময় না রেখে যেতে পারে না। আমরা ভাবি, এ আর-কি, অথচ সেজন্যই ক্ষতিপূরণ করতে হয় জীবন থেকে। মানসিক সুখ হারিয়ে ফেলি চিরতরে। অথচ স্রষ্টার নির্দেশনায় কল্যাণ আছে, ধর্মের আচারে আছে প্রশান্তি। ভাগ্যকে উপহাস করার অর্থই ব্যর্থতাকে আলিঙ্গন করতে স্বেচ্ছায় এগিয়ে চলছি। সুখের ঠিকানা খুঁজে পেতে ভুল পথে লড়াইয়ে নেমেছি। তাছাড়া- আর কী? জীবনের যাত্রা যে যখন যেখান থেকেই আরম্ভ করি- আমাদের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় ঠিকঠিক থামতে হবে। আমরা সেটা সবাই জানি- মৃত্যুকে এড়ানো যায় না। যখন শরীরে শক্তি থাকে, অর্থ ও ক্ষমতা যখন ঘিরে রাখে- তখন হয়তো ভুলে যাই আমার পরিণতি কিন্ত সময় উপস্থিত হয়ে সেই সময়কে চিনিয়ে দেয়। জানিয়ে দেয়, এখনই এখানে থামতে হবে। চলো- রওনা করি। অনুমতি না পেলেও অন্তিম যাত্রা থামবে না।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন