নজরুল ইসলাম ||
শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনাটি আসলেই চরম বেদনাদায়ক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক নির্মম প্রতিফলন। এমন একটি ঘটনার পর সমাজে তীব্র ক্ষোভ, শোক এবং "কেন আমাদের সমাজ এই পর্যায়ে নেমে গেল?"—এই প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই ধরনের চরম অধঃপতনের পেছনে বেশ কিছু গভীর ও কাঠামোগত কারণ জড়িয়ে থাকে। ধর্ষণ অতঃপর হত্যা এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে পূর্বে বিস্তারিত আর্টিকেল লিখেছি। ধর্ষণ সম্পূর্ণরূপে অপরাধীর বিকৃত মানসিকতা এবং নৈতিক স্খলনের ফল। এই অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা যখন কোনো সমাজে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, তখন অপরাধীদের মনে কোনো ভয় থাকে না। অতীতে ঘটে যাওয়া বহু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত না হওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধী চক্রকে আরও দুঃসাহসী করে তোলে।
সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম ক্ষয় পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং অন্যের অধিকার ও জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হওয়া এই ধরনের অপরাধের প্রধান চালিকাশক্তি। সহানুভূতি ও মানবিকতার চেয়ে পাশবিকতা ও ক্ষমতার দাপট যখন ব্যক্তিমানসে প্রাধান্য পায়, তখন সমাজ এতটা নিচে নেমে যায়।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের অপরাধের পেছনে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং দুর্বল বা একা পেয়ে কারও ওপর চরম আধিপত্য বিস্তারের এক বিকৃত মানসিকতা কাজ করে। শিকারের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই পাশবিক চেষ্টা কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, বরং এক চরম ক্ষমতার প্রদর্শন।
মাদকের বিস্তার ও সুস্থ বিনোদনের অভাব সমাজে মাদকের সহজলভ্যতা এবং অপরাধমূলক গ্যাং কালচারের বিস্তার তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশকে চরম সহিংস আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সুস্থ বিনোদন, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের অভাব এই শূন্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমাজের পথভ্রষ্ট এই ইন্ডিভিজুয়ালদের এই জগত থেকে বেরিয়ে নিয়ে আসা কিংবা উত্তরণের উপায় কি? এই অন্ধকার অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল ক্ষোভ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন:
দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার: অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা।
সামাজিক প্রতিরোধ: নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লায় ও অনলাইনে সোচ্চার হওয়া।
পরিবার, বিদ্যালয় ও গণমাধ্যমে নৈতিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা জোরদার করা। মূল্যবোধের শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে ।
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল। পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানতে পারে এবং অভিযুক্ত সোহেল রানা নামক এক ব্যক্তিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনাটি চরম সামাজিক অবক্ষয়ের এক নির্মম প্রতিফলন।
রামিশার মতো আর কোনো প্রাণ যেন এভাবে ঝরে না যায়, সেজন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। বিষয়টি এমন নয় যে, প্রতিটি দুর্ঘটনা ঘটার পর আমরা জেগে উঠি, প্রতিবাদী হই , সুখ প্রকাশ করি অতঃপর ঘুমিয়ে পড়ি আরেকটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, চিপ এডিটর -thesylhetpost #ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ওয়ার্কার #স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা, ইউনিসন (আরএম
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন