দেলোয়ার জাহিদ//
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ইত্তেফাক-এ ৪ মে ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—“মব ইজ আ রিঅ্যাকশন অব দ্য পিপল।” আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের প্রেক্ষিতে ‘মব’ সহিংসতা বিচারযোগ্য কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী যুক্তি দেন, মব কোনো পদ্ধতিগত বা ব্যাপক পরিকল্পিত অপরাধ নয়; বরং এটি জনগণের প্রতিক্রিয়া, যা সাধারণ আইনের আওতায় বিবেচিত হতে পারে। আরও বলেন, এসব ঘটনাকে বিচার করতে গেলে স্বাধীনতাসংগ্রাম, গণ–অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই বক্তব্য রাজনৈতিক ও দার্শনিক—দুই স্তরেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়: মব কি সত্যিই কেবল জনগণের প্রতিক্রিয়া, নাকি এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ?
প্রথমত, “মব ইজ আ রিঅ্যাকশন অব দ্য পিপল”—এই ধারণাটি সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে প্রোথিত। Jean-Jacques Rousseau-এর “General Will” ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্র তখনই বৈধ যখন তা জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। যখন রাষ্ট্র সেই দায়িত্বে ব্যর্থ হয়—বিচারহীনতা, বৈষম্য কিংবা দমন-পীড়নের মাধ্যমে—তখন জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণই অনেক সময় মব আচরণে রূপ নেয়।
তবে এই ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। Thomas Hobbes মবকে দেখেছিলেন সভ্যতার বিপরীতমুখী শক্তি হিসেবে—যেখানে সমাজ “state of nature”-এ ফিরে যায় এবং “war of all against all” পরিস্থিতি তৈরি হয়। অন্যদিকে John Locke মনে করেন, রাষ্ট্র যদি মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের প্রতিরোধ ন্যায্য হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিরোধ যখন আইনের সীমা অতিক্রম করে, তখন তা ন্যায়বিচারের বদলে প্রতিশোধে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়—মব একদিকে ন্যায়বিচারের বিলম্বের প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে আইনের শাসনের জন্য হুমকি। অর্থাৎ, এটি নৈতিকভাবে বোধগম্য হলেও রাজনৈতিকভাবে খুবই বিপজ্জনক।
দ্বিতীয়ত, “মব ইজ আ ডিনায়েল অব স্টেটহুড”—এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও কাঠামোগত। Max Weber রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকারী হিসেবে। যখন রাষ্ট্র এই কর্তৃত্ব কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই শূন্যতা পূরণ করে মব। ফলে মব কেবল জনতার আবেগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ভাঙনের সুস্পষ্ট লক্ষণ।
এই ব্যাখ্যায় তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
ক্ষমতার শূন্যতা—আইন প্রয়োগের দুর্বলতা
রাষ্ট্রীয় নীরবতা বা পরোক্ষ মদদ
বিচার ও প্রশাসনের প্রতি আস্থার অবক্ষয়
Hannah Arendt দেখিয়েছেন, যেখানে বৈধ ক্ষমতা দুর্বল হয়, সেখানে সহিংসতা বেড়ে যায়। এই দৃষ্টিতে মব হলো একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রের উপসর্গ—“symptom of broken statehood”।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি। গণ–অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের সাথে মবকে এক কাতারে ফেলা দার্শনিকভাবে সঠিক নয়। গণ–অভ্যুত্থান সাধারণত জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ হলেও, বিপ্লব একটি সংগঠিত ও আদর্শভিত্তিক রূপান্তর প্রক্রিয়া। কিন্তু মব—তা প্রায়শই অনিয়ন্ত্রিত, তাৎক্ষণিক এবং আইনের সীমা অতিক্রমকারী সহিংসতা, যার লক্ষ্য সবসময় ন্যায় প্রতিষ্ঠা নয়।
অতএব, মবকে শুধুমাত্র “জনগণের প্রতিক্রিয়া” হিসেবে বৈধতা দেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি একে কেবল “রাষ্ট্রের ব্যর্থতা” বলে দায় এড়ানোও অসম্পূর্ণ। বাস্তবতা হলো—মব এই দুইয়েরই সংযোগস্থল। এটি একদিকে জনগণের হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও অকার্যকারিতার প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে বড়—এটি রাষ্ট্রের বৈধতা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন। যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে মব জন্ম নেবে; কিন্তু যদি মবকে সহনীয় বা বৈধ বলা হয়, তবে রাষ্ট্র নিজেই তার অস্তিত্বের ভিত্তি দুর্বল করে ফেলবে, ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই দ্বিমুখী—ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন অটুট রাখা। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন