প্রতিশোধের চেয়ে পরিবর্তন উত্তম। প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে চুপ থাকা ভালো। রোজকার জীবনাচারে সত্যের এই অমোঘ সত্য বুঝতে বুঝতে বেলা পড়ে আসে। একদিন উপলব্ধি হয়- মনোমালিন্য না ঘটালেও হতো। বিষয়টা তো সামান্যই ছিল। কথাটা অন্যভাবে হলে দূরত্ব সৃষ্টি হতো না। বৃষ্টির মতো চোখের পানি না ঝরলেও পারতো।
প্রতিহিংসা ভালো কিছু বয়ে আনে না। মানুষ তার জীবনে করা প্রত্যেকটি ভুল বুঝতে পারে। তবে অসময়। অনেকেই ইগোর কারণে ক্ষমা পর্যন্ত না চেয়ে ভুলটাকেই সঠিক সাব্যস্ত করতে চায়। ফলাফল তো জানাই। সম্পর্ক শত্রুতায় বদলে যায়। মুখ দেখাদেখির পাট চুকে যায়। দীর্ঘশ্বাস-আভিশাপ বয়ে বেড়ানোর খেয়ায় সময় পাড়ি দেয়।
মানুষে মানুষে যে দূরত্ব সে-সবের অধিকাংশই ঠুনকো কারণে। একটা কথার জন্য বদলে যায় সম্পর্কের মানচিত্র। মানুষ অনেকক্ষেত্রেই অবিবেচকের মতো কথা বলে। যা বলার দরকার না সেটা বলেই বিপদ বাড়ায়। কথারও যে বাটখারা আছে- অনেকেই মানে না। সব কথা সর্বত্র সাজে না। বলতে অনেকেই জানে কিন্তু কোথায়, কখন থামতে হবে সেটা অনেকেই ভাবে না।
জিহ্বার মতো হাড়বিহীন অঙ্গ কলিজা পর্যন্ত ছিদ্র করে দিতে পারে। অথচ শরীরে এই অঙ্গই মন ভিজিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। দম্ভ-অহংকারের আতিশয্যে মানুষ ভুলে যায় অবস্থান। পাশ কাটিয়ে চলে দায়িত্বের। নিজেকে জাহির করার প্রবণতাই হিংসার উদ্রেক করে। অথচ বিনয়ের শোভা কত মোলায়েম। নত হয়েছে আর পুরস্কৃত হয়নি, প্রশংসা পায়নি- দৃষ্টান্তেই নেই। প্রভু বিনীত আত্মাকে সম্মানিত করেন।
শক্তির শত্রুতা শিরোধার্য করা ঠিক নয়। ক্ষমতা থাকলেই দেখানো যায় না। সুযোগ পেলেও অন্যায় সাজে না। বিবেকের কাছে শুভ্র ও নির্মল থাকতে হবে। এক ইঞ্চি জমিনের জন্য আইল ঠেলাঠেলি করে রক্তারক্তি করাকে একদিন অনর্থক মনে হবে। কথা না বলার কষ্টও একদিন ঠিকঠিক জাগবে। সম্পর্ক ভাঙার বেদনায় একদিন কলিজায় ব্যথা জাগবে।
মানুষ বড়ত্বের প্রবণতায় অনেক ভুল করে। যে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে সে একদিন এতোটাই বৃহত্তর হয়ে দাঁড়ায়- সমাজ তার সামনে স্যালুটে নত হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে বিরত থাকতে হবে। দেখে নেওয়ার প্রবণতা মানসিক ব্যাধি। জয় করতে হবে অপতৎপরতা থেকে। সবরের সুফল আছে। এখনই নয়- আরেকটু পরে- প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিরোধের ধরণটাই বদলে যাবে।
পরবর্তীতে যাতো অনুশোচিত হতে না হয় সেভাবেই হোক আচরণ। সমাজের বিচরণ হোক বিনয়ে। কী লাভ অহমিকা দেখিয়ে? যে দেখে নেওয়ার কথা ছিল তাকেই এখন কে দেখে? সময় সর্বোত্তম প্রতিষেধক। অন্যায় হচ্ছে- চুপ থাকুন। আপনার হয়ে যদি সময় প্রতিত্তর করে দেয় তারচেয় উত্তম আর-কী? সবকিছু সাধ্যে থাকে না। আফসোস করলে নিজের প্রতি অবহেলাই বাড়ে।
হতাশা ওষুধ নয় বরং রোগ। মানসিক সুস্থতার জন্য অল্পে তুষ্টির মনোভাব গড়তে হবে। সুখ আসলে সীমিতেই থাকে। যা-কিছু নিজের, যা আছে সাধ্যের তাতেই সন্তুষ্ট থাকলে দুঃখ দীর্ঘায়িত হবে না। কাউকে বকাবকি করলে, রাগ করে মনে ব্যথা দিলে কিংবা অহেতুক অভিশাপ দিলে তাতে নিজেরই বেশি ক্ষতি হতে পারে। যিনি নিরবে দেখছেন তার ওপরে ভরসা রাখাই শ্রেয়। মানুষের ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আস্থাবান হওয়া উচিত।
যে ঠকায় সেই কেবল ঠকে। কাজেই কারো সামান্যতম অধিকারও নষ্ট করা ঠিক নয়। প্রত্যেককেই অন্যায়ের দায় বহন করতে হবে। মানুষ নয়- সময় হিসাব নেবে। কোথাও অযাচিত হস্তক্ষেপ নিন্দনীয়। যার দায়িত্ব তাকেই পালন করতে দিতে হবে। ধর্ম মতে, নিজের দায়কে নিজেকেই বহন করতে হবে বলে বলছে। সুতরাং পৃথিবী বদলানোর দায়িত্ব না নিয়ে নিজেকে বদলালে পৃথিবী বদলে যাবে।
কেবল অভিযোগের পরিণতি ভালো না। জীবনের নামে যত কম অভিযোগ উত্থাপিত হবে তত বেশি সুখী হওয়া সম্ভব। প্রত্যাশার পারদ সামর্থ্যের সীমার মধ্যে থাকুক। সময় সকলের পরীক্ষা নিচ্ছে। সুদিনেও পরীক্ষা, দুর্দিনেও পরীক্ষা। সীমালঙ্ঘন করা এবং লড়াই ছাড়াই হাল ছাড়া- দু’টোই নিন্দনীয়। সংকটে ইস্পাত-দৃঢ় থাকতে হবে। মচকানোর আগেই ভাঙা যাবে না।যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা যেন মানুষের কাতারে থাকি— নামাজের কাতারের মতো সমান্তরালে।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন