রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলছে, অযথাই হাসছে, অপ্রয়োজনে সাজছে, অতিরিক্ত শপিং করছে, ভিডিওতে ঢঙ দেখাচ্ছে, সারাক্ষণ ছবি তুলছে, ওভার থিংকিংয়ে হাইপার হচ্ছে, কল্পনার শত্রুকে ভাবছে কিংবা অহেতুক কাজ-কর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে- হতে পারে তার সময়টা একাকীত্বে যাচ্ছে। অর্থের অভাব পূরণ হয় কিন্তু বলতে চাওয়া কথা না বলতে পারার অভাব মনে আগুন ধরায়। স্বাভাবিকতার বাইরে কোনোকিছু ঘটলেই সেখানে কিঞ্চিৎ কিন্তু আছে।
এই যে ফেসবুকে ব্যয়িত লম্বা সময়- মানুষের সাথে তার মিলছে না। কেবল বইয়ের সাথে কাটানো দীর্ঘরাত- মানুষ থেকে দূরে থাকার অপ্রাণ চেষ্টা ছাড়া আর কিছু? যা কিছু অতিরিক্ত সেটা উপযুক্ত কোনোকিছুর ঘাটতি। মানুষ সবকিছুকে ফাঁকি দিতে পারলেও একাকীত্বকে উপেক্ষা করার সাধ্য তার নাই। ধেয়ে এসে মনকে চেপে ধরার যে বাস্তবতা তাকে অস্বীকার করতে পারি কিন্তু এড়িয়ে থাকতে পারি না।
যিনি একাকীত্বে ভোগে তার মন খুঁত খুঁত করতে থাকে। প্রত্যেক আচরণে তার মনে হয় অন্যরা বুঝে ফেলল কি না! সেজন্য সে যাই করে সেটাই বেশি বেশি করে! হাসলেও হো হো করে ওঠে! সাজলেও রঙচটা ভাব আনে। কথা বলতে আরম্ভ করলে সব উগড়ে দেয়। নীরব একাকীত্ব সাংঘাতিক না। তবে যদি লোকের মাঝে থেকেও একাকীত্ব অনুভূত হয়, নিজেকে অসহায় লাগে তবে মনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়।
ওপরে ওপরে রঙচঙে থাকলেও একাকীত্বে ভূগতে থাকা মন ও শরীর দ্রুতই বুড়ো হয়ে যায়। সে অন্যরকম চিন্তা করতে আরম্ভ করে। যে চিন্তা তাকে সন্দেহবাতিকতা ও সংশয়ে আচ্ছন্ন রাখে। একাকীত্বে ভূগতে থাকা মানুষ কাউকেই স্বাভাবিক বিশ্বাস করতে পারে না। তার মন খুঁতখুঁতে স্বভাবের হয়ে যায়। যেন মনে হয় সবাই তাকে ঠকাচ্ছে। তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে!
একাকীত্ব ভয়ানক ভোগান্তির। যে এই সময়কে পাড়ি দেয় সে-ই কেবল জানে। হরেক মানুষ কাছে থাকলেও একাকীত্ব ঘুচে না যদি পছন্দ ও রুচির অমিল থাকে। মতাদর্শের বৈধতা ছাড়া দূরত্ব কমে না। একাকীত্ব নীরবঘাতক। মানসিক চাপে চাপে জীবন বিষিয়ে দেয়। হতাশার গ্লানি, জীবনের দীর্ঘশ্বাস এবং ভাগ্যকে দায়ী করতে করতে জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়।
জীবনে রঙ, আনন্দ ও সৌন্দর্যের আলো সব হারিয়ে মৃত্যুকে খুব কাছের মনে হয়। জগতে একমাত্র মৃত্যুকেই আপন মনে হয়। যে কেবল মৃত্যুই কামনা করে সে নবতর কোনোকিছু সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারে না। তখন সবকিছুকে কেবল পর পর মনে হয়। জীবন মনে হয় এলোমেলো। মনে ভয় ধরে। এই ঘুম শেষ ঘুম হবে কি-না এমন ভাবনায় ঘুমাতে গেলেও ভয়ানক দুঃস্বপ্ন চেপে ধরে।
মনের কথা বলতে না পারার বেদনাই একাকীত্ব। নিজেকে বোঝাতে না পারা থেকে তৈরি হয় মানসিক চাপ। তখন মনে হতে থাকে- সবাই আমাকে ঠকাচ্ছে। জগত সংসারে আমার কোনো মূল্য নাই কিংবা কেউ আমাকে ভালোবাসে না- এই রোগে একবার যাকে ধরেছে সে মানসিক শান্তিতে বাঁচতে পারেনি। সবাই এড়িয়ে চলছে- মাথায় এ ভাবনা ঢুকলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা মুশকিল।
একাকীত্বে ভুগতে থাকা মানুষ বড় বড় ভুলের পথে অনায়াসে পা বাড়ায়। যদিও বাহির থেকে তাদের দেখে খুব কঠিন ও কঠোর মানসিকতার মনে হয় কিন্তু সামান্য আঘাদ কিংবা কথার টোকাতেই তারা ভেঙে পড়ে। সহজেই ঠকে এবং মরণের কথা বারবার ভাবে! যে জন্য তাদের জীবন জীর্ণ হয়ে থাকে। অথচ উপভোগ্যতাই জীবনের শ্রী। একাকীত্ব জড়িয়ে যাওয়া মানুষ জীবনের সব সত্য দেখতে পায় না। কেমন এক অন্ধ অন্ধ এবং অন্ধকারের স্বভাবে ডুবে যায়
মানবজনমে একাকীত্ব এক ভয়ানক ব্যাধি। কাজেই উপযুক্ত প্রতিকারের দ্বারা জীবনকে রক্ষা করতে হবে। শখ ও ইচ্ছার মূল্য নির্ধারণ ব্যতীত জীবনের গতি নাই। নিজ নিজ জীবনকে গুছিয়ে রাখা প্রত্যেকের দায়িত্ব। সেক্রিফাইজ ও কম্প্রোমাইজের দ্বারা জীবনকে ভারসাম্য করতে হবে। কোনোকিছুতেই অতিরিক্ত আবেগ কিংবা চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করা যাবে না। কেবল নিজের বিশ্বাসের গণ্ডিতেও প্রদক্ষিণ করাও যাবে না।
যখন জীবন যেভাবে সামনে আসবে সেভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। যে একাকীত্ব মনের ওপর চাপ তৈরি করে তা ধ্যান ও পরিশ্রম দ্বারা জয় করতে হবে। একটা সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনের অধিকার সবার আছে। সেখানে ব্যত্যয় ঘটানো মানে নিজের ওপর নিজেই জুলুম চাপিয়ে দেওয়া। পরিমিত জীবনাচার ও জীবনকের অনুষঙ্গগুলোর আনন্দময় উদযাপনে জীবনে ফাগু আসুক। মনের আগুন নেভানোর চাবিকাঠি নিজেকেই আগলাতে হবে। জীবন সুন্দর- সেটাকে নষ্ট করে কষ্ট পাওয়ার দায়টা যাতে নিজের ওপরে না চাপে।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন