ঈদযাত্রার ফেরিতে মৃত্যুর ফাঁদ

gbn

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক। 

বাসের উল্টি দিয়ে নদীতে পড়ার দৃশ্যটা আপনি সহ্য করতে পেরেছেন? দম বন্ধ হয়ে আসে না? জীবনে যতবার বাসে করে ফেরি পাড় হয়েছি, বাবা বারবার ফোন দিয়ে বলতেন, ফেরি পারাপারের সময়ে কোনোভাবেই বাসে থাকবে না। অথচ প্রত্যেকবার মনে হতো ফেরিতে ওঠার সময় বাসে থাকাটাই তো নিরাপদ! আজ বাবার সেই কথা বারবার কানে বাজছে, ফেরিতে ওঠার সময় কোনক্রমেই বাসে থাকবি না। বাবাদের আদেশ কত উপকারী,  কতখানি প্রাসঙ্গিক। 

 

কত আনন্দের ঈদ উদযাপন শেষে কর্মস্থলে/বাসাবাড়িতে ফেরার কালে অবতীর্ণ হলো দীর্ঘ বেদনার ক্ষত। চোখের পলকেই নাই হয়ে গেলো কতগুলো জীবন। বাংলাদেশে জন্মানো মানে আল্লাহর মাল হয়ে যাওয়া। এখানে জীবনের সামান্যতম গ্যারান্টি নাই। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে তাও নিশ্চয়তা আছে- মিসাইলের আঘাত পেলে মরন নামবে! আর এখানে ঘাটে ফেরি নাই তবু তীব্র গতিতে বাস জেটিতে নেমে উল্টে পানিতে পড়ে! কয়টা পয়সার জন্য যে প্রতিযোগিতা তাতে ড্রাইভারদের কাছে মানুষের জীবনের মূল্য গরু-ছাগলের চেয়েও কম! বাসের মালিকেরা ঈদ/বকরিদে সারাবছরের ব্যবসা করতে হাপিত্যেশ করে। ড্রাইভার নির্ঘুম ড্রাইভ করে। ট্রিপের পর ট্রিপ। 

 

ভিডিও দেখলে আপনি বলবেন, ওই মুহূর্তে বাসটির জেটিতে ওঠার কোনোই যুক্তি নাই। অথচ তাড়াহুড়োয় নাই হয়ে গেলো অর্ধশত জীবন। কোনো কোনো পরিবারের হয়তো একজনও বেঁচে নাই। দূর পাল্লার বাসে উঠলে জান হাতে নিয়ে মুখস্থ সব দোয়া-দরুদ পড়ে খতম দিতে হয়। তাও বুকের দুরুদুরু থামে না। এই বুঝি ছিটকে পড়লো লেন থেকে, লাগলো মুখোমুখি! ড্রাইভারদের ট্যাকলিং, রেসলিং সব চলে। সামনে কোনো টিকটকারের হাতে ক্যামেরা দেখলে ড্রাইভার আরও মাতে। চলতি পথে অনেক ড্রাইভারকে নেশার ঘোরে মাতাল মনে হয়েছে। ড্রাইভিং-এর সময় ফোনে কথা বলা আইন বিরোধী তাও কথা বলছে, ড্রাইভারও যাত্রী ডাকছে!  তাও জীবন ও জীবিকার তাগিদে মরণ কবুল করে পথ পাড়ি দিতে হয়। 

 

ঈদ পরবর্তী ফিরতি যাত্রায় যে দূর্ঘটনা ঘটেছে তদ্রুপ চিত্র সড়ক দূর্ঘটনার বাংলাদেশের নিত্যাকার চিত্র। রাত তিনটায় ট্রেন বাসের সংঘর্ষে স্পটে ১২ জন নিহত হওয়ার দৃশ্য আপনি কোনো সভ্য দেশে কল্পনা করতে পারেন? বিদেশে এসব ঘটলে পদত্যাগের হিড়িক পড়ে যেত। বাসে-বাসে, বাস-ট্র্যাকে সংঘর্ষ হতে পারে কিন্তু বাসে-রেলে সংঘর্ষ হবে- দায়িত্বশীলরা না ঘুমালে কিংবা মাতাল না হলে এও ঘটা সম্ভব। রাস্তা থেকে আজ যে গতিতে জেটিতে এসে বাসটি ছিটকে পানিতে পড়েছে তা হেলপার ড্রাইভ করলেই কেবল ঘটতে পারে! পথেঘাটে সবকিছুই আসলে আনফিট লোকে চালাচ্ছে। যার যা কাজ না তাই সে করছে! 

 

দূর্ঘটনা নসীব। তবে ভিডিওতে বাসের দুর্ঘটনার যে চিত্র দেখলাম তা তো সাক্ষাৎ খুন। কত সস্তা মানুষের জীবন। বাংলাদেশের সড়কপথ কী কখনোই নিরাপদ হবে না? বেঘোরে মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না? মানুষকে মারার জন্য, মানুষের মরার জন্য এতো তাড়াহুড়ো কেন? সড়ক দূর্ঘটনার শাস্তির আইনকে আরও যুগোপযোগী করতে হবে। পঁচিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকায় মানুষের জীবনের দাম চুকানোর রেওয়াজ বন্ধ করে অস্বাভাবিক মৃত্যু কমিয়ে আনতে দ্যেগ নিতে হবে। 

 

সাধারণের এমন মরণের দায় কে নেবে? কে থামাবে এই লাশের মিছিল? নিরাপদ সড়ক কোনোদিন ফিরবে না? একটা ঈদ যাত্রাও স্বস্তির এবং মৃত্যুহীন হবে না? নদীতে জাল পেতে মাছ ধরতে চাচ্ছিলাম। এখন তো জালে লাশ উঠে আসছে, কেবল লাশ। এই লাশে ভার পরিবার-রাষ্ট্র বইতে পারবে? আর কতগুলো লাশ জড়ো হলে লাশের মিছিল পূর্ণতা পাবে- বলতে পারো?

 

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন