বন্ধুত্বের নামে প্রভাবের বাজার

gbn

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক। 

এক.

ব্যবসায়ী নবীনের দেশ ত্যাগে দেশের বড় ক্ষতি হবে- ব্যাপারটি তেমন নয়। পাঞ্জাবি ৩০০ টাকায় বিক্রি হোক কিংবা তিন হাজারে- তাতেও অনেক মানুষের তেমন কোনো মাথা ব্যথা নাই। তবে মনে পড়ছে দুঃসহ স্মৃতির কথা। তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব তারেক রহমানের বন্ধুত্বকে বিক্রি করে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন নামের এক ব্যবসায়ী জিয়া পরিবারকে দেশের সাধারণ মানুষদের সামনে বিতর্কিত করেছিল। 

 

সেই চল আবার চালু করেছে একদল। নবীনের পাঞ্জাবির ব্যবসা বন্ধ করতে যারা জোর দেখিয়েছে, আইন প্রয়োগকারীদেরকে প্রভাবিত করেছে তারাও পরিচয় দিচ্ছে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বন্ধু। এটাই আপত্তির, এটাই ঝুঁকির। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার পরে, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পরে তারেক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কোনো কথা, কাজ কিংবা পদক্ষেপে সামান্যতম ক্ষেত্রেও মনে হয়নি তিনি অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। বরং তিনি যেখানে অন্যায় দেখছেন সেখানেই তা বন্ধে বা দমনে মন্ত্রী, এমপি কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি দলীয় নেতা-কর্মীদের দিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। ন্যায্যতা তথা ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছেন।

 

নবীন ফ্যাশনের পাঞ্জাবির দাম কত, কী কারনে মগবাজারে নবীনের আউটলেট বন্ধ করে স্বত্বাধিকারীকে বিদেশ চলে যেতে হলো- সেসব এখন ততটা আলোচনায় নাই। বিরোধীপক্ষ এমনকি সাধারণ দেশবাসীর আলোচনার খোরাক- যারা নবীনকে কমমূল্যের পাঞ্জাবি বিক্রি করতে দেয়নি তারা নিজেদের পরিচয়ে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের বন্ধুত্বের কথা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এটাও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসবে এবং বন্ধুত্বের নামে ভাঁওতাবাজি করা ধান্ধাবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে তিনি অচিরেই নির্দেশ দিবেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে সে আস্থা ও বিশ্বাস ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

 

শাসকেরও বন্ধু থাকতে পারে। তবে যেই বন্ধুরা বন্ধুত্বের ক্ষমতাকে পুঁজি করে স্বার্থসিদ্ধি করে তাদেরকে শাস্তি না দিলে আবারও দুর্নাম রটবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাত্র মাসখানেকের শাসনকালে কত কত ভালো কাজের গোড়াপত্তন হয়েছে। এসবে সবাই বিশাল আশাবাদের মুকুল দেখছে- এসব যেন কোনোভাবে ষড়যন্ত্র, চক্রান্তকারীরা ভেস্তে দিতে না পারে। বন্ধুত্বকে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার বানিয়ে আর কেউ যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে- সে ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ থাকতে হবে। 

 

বিরোধীপক্ষ যেসব ক্ষত নিয়ে শাসকদলকে আঘাত করতে পারে সেসব সুযোগ যাতে ক্ষমতাসীনরা মোটেও না দেয়। পাঞ্জাবি কত টাকায় বিক্রি হবে সেটা পরের ফয়সালা। আগে বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে পুলিশকে প্রভাবিত করে অন্যের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার রায় হোক। দেশে মানবিক ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ তৈরি করতে নবীনদেরকে বড্ড দরকার। তারা যেন ভয় না পেয়ে, বাধাগ্রস্ত না হয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারে তার নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো ভীতি দূর করে স্বাধীনতা ভোগ করার ক্ষমতা প্রদান করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।  

 

নবীনের বক্তব্যেরও সত্য-মিথ্যা যাচাই হওয়া দরকার। যদি অভিযোগ সত্য হয়  তবে যে ওসি নবীনকে ফোন দিয়ে কিংবা সামনাসামনি আলাপে নবীনের বিরোধীপক্ষের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বন্ধুত্বের কথা বলে নবীনকে ভয়ভীতি দেখিয়েছে তাকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এই ঘটনার আসল ক্রিমিনাল এবং তাকে পৃষ্ঠপোষকতাকারী- কেউ যাতে ছাড় না পায়। 

 

দুই.

একজন ব্যবসায়ীর তার পণ্যকে স্পল্প মুনাফায় বিক্রির অধিকার কেন থাকবে না? ভোক্তা অধিকারের অভিযানে মাঝে মাঝে দেখি শ'টাকার পণ্য হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেগুলো ধরা পরে না সেগুলো ব্র্যান্ড বলেই ক্রেতা স্বস্তি নিয়ে ব্যবহার করে! আমরা আসলে সর্বত্র জিম্মি। উপায়হীন হয়েই স্বেচ্ছায় ঠকি। মানুষ ঠকানোর ব্যবসায়ীতে বাজার ভরে গেছে। কোন পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে না? সর্বত্রই সিন্ডিকেট। দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ বিদ্যমান অথচ হুজুগে দাম বেড়েছে দ্বিগুণ/তিনগুণ। তাও সর্বত্র মিলছে না। প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে শরীর তেল শুকিয়ে যাচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে একদল হাজার কোটি টাকা পলকের মধ্যে আয় করে নিচ্ছে। রোজার শুরুর দিকে শসা, লেবু দিয়েও সাধারণ ক্রতাদের নাকানিচুবানি খাওয়ানো হয়েছে। কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়লেই সেগুলোর কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া ব্যবসায়ীদের জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে। 

 

অনেক মন্দের মধ্যে একজন ভালো মানুষ উজানে দাঁড়ালে তাকে আর ভালো চোখে দেখা হয় না। নবীনের শো-রুমে ৩০০ টাকায় পাঞ্জাবি পাওয়া যেতো, দুইশো টাকায় পাজামা- এটাই কাল হয়েছে তার ব্যবসার। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের জোর আছে। তাদের হাতও লম্বা। কাজেই নবীনদের উচ্ছেদ হওয়াই নিয়তি। ২৪০ টাকা উৎপাদন খরচ, ১০ টাকার ব্যাগ তথা ২৫০ টাকা পুঁজি খাটিয়ে নবীন তাতে ৫০ টাকা লাভ করে ৩০০ টাকায় বিক্রি করছিল। এটাই আপাতত নবীনের অপরাধ। অথচ এটা যদি তিনি ১৮০০ বা ততোধিক দামে বিক্রি করতো তবে কারো কোনো অভিযোগ থাকত না। চারদিকের অনেকদিকে ব্যবসাটা আসলে সেভাবেই চলছে। নবীন চেয়েছিল ব্যবসাতেও ইনসাফ। ফলাফল, জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে নবীন দেশের সীমানা পেরিয়ে একপ্রকার পালিয়েই গেছে! 

 

সততা এদেশে এখন স্ক্যাম। কত অল্প টাকায় খেজুর আমদানি করে তা বাজারে কত চড়া দামে বিক্রি হয় তার গল্প মাঝে মধ্যে পত্রিকা-টেলিভিশনে দেখা যায়। জীবন রক্ষাকারী বিদেশি ওষুধের বাণিজ্যের কথা  গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বারবার বলেছেন। কেউ কারো কথা শোনে না। সবাই ব্যবসা বোঝে। এক টাকা পণ্য পাঁচ থেকে পঁচিশ টাকায় বিক্রি করার ব্যবসা। জনতা তো জিম্মি। আজ পর্যন্ত সরকার বারবার চেষ্টা করেও সব পন্যের শরীরে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে পারেনি। অতীতে, বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে- ব্যবসায়ীরাই রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্তা! সেখানে সাধারণ মানুষের মুক্তি মেলা এতো সহজ না।

 

তিন.

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে স্বপ্ন অফুরান। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে তিনি অগ্রনায়ক হবে। বাতিঘরের ভূমিকা নিয়ে জাতিকে পথ দেখাবেন। আগমনী ভাষণে তিনি যে প্ল্যানের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে দুষ্টের দমন করতে হবে। ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়-অপরাধ বন্ধ করতে না পারলে কোনোকিছুরই পরিবর্তন ঘটবে না। যারা ক্ষমতাশীনদের পরিচয় ও ছবি বিক্রি করে স্বার্থের ধান্দা হাসিল করে, স্বার্থ পূরণ করে তাদেরকে শৃঙ্খলবদ্ধ করতে হবে। মন্দের আশ্রয় উম্মুক্ত আঙিনায় রাখা যাবে না। ভালো মানুষদের অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দিতে হবে। 

 

ব্যবসায়ীদেরকে হালাল তরিকায় ব্যবসা করতে বাধ্য করতে হবে। কোরআন ও হাদিসে ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের মতো আলাদা মর্তবা ও মর্যাদা আর কোনো পেশাজীবীদের নেই। অথচ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সব পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষদেরকে জিম্মি দশা থেকে মুক্তি দিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র আশার বাতিঘর। দেশবাসী আর কোনো অন্যায়ের অন্ধকারে দিশা হারাতে চায় না।

 

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন