রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
যে পিঁয়াজ আমি ছাব্বিশ টাকায় কিনি, যে আলু খুচরা বাজারে ১৮ টাকায় বিক্রি হয়, যে শসা ১৫ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে- এসব কৃষিপণ্য বিক্রি করে উৎপাদক তথা কৃষক কত পাচ্ছে?
বাংলাদেশের কৃষক মারার অনেকগুলো পদ্ধতি আছে। কৃষকের কাছে রসুনের সের এখন ত্রিশ টাকা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, মস্তিষ্ক গলা রোদে পরিশ্রম করে যদি দু'টো পয়সা না পায় তবে সে কাজ দ্বিতীয়বার কৃষক করবে? করবে। করতে সে বাধ্য। বেঁচে থাকার জন্য তার আর কোনো বিকল্প নাই। তবে কৃষক তার সন্তানকে কৃষিতে আর রাখতে চাচ্ছেন না। এর খেসারত ১০-১৫ বছর পরে পাওয়া যাবে! কৃষকের সন্তানের পেশার রূপান্তর মানে আপনার সন্তানের নির্ভরতায় রূপান্তর!
যেকোনো পণ্য তিন মাস পরিশ্রম করে ফলিয়ে কৃষক যে টাকা পায় তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি লাভ করে দু'দিন ব্যস্ত থাকা ফরিয়া। কৃষক যে বেগুন ক্ষেতখামারে বসে ১৬ টাকা সের বিক্রি করে সেটা ঢাকার বাজারে আসতে আসতে ৮০ টাকা হয়ে যায়। লেবু যে ৯০ টাকা হালি বিক্রি হলো তা কি লেবুর গাছে জানে?
এই আমরাই তো ২৫০-৩৫০ টাকায় পিঁয়াজ কিনে খেয়েছি। ৭৫ টাকায় আলু। বেশিদিন আগে? রমজানের শুরুতেই তো শসা কিনেছিলাম ১২০ টাকা কেজিতে। কৃষক কত করে পেয়েছিল? আরেকটা কথা। সভ্য সমাজের পরিমাপে ৪০ সেরে মন হয়। কিন্তু কৃষকের কাছ থেকে যারা পাইকারি ক্রয় করে তাদের মন কত কেজিতে? সর্বনিম্ন ৪২ কেজিতে। কোনো কোনো পণ্য ৪৮ কেজিতেও এক মন! কৃষক নিরুপায়। বেচলে বেচবা। না বেচলে পচবে। কৃষকের বাঁচতে বাধ্য হয়ে বেচতেই হয়।
কৃষকের উৎপাদিত যেকোনো পণ্যের মূল্যের সর্বনিম্ন ধাপ নির্ধারণ করা উচিত। কৃষক কি কেজি প্রতি ১২ টাকায় পিঁয়াজ উৎপাদন করতে পেরেছে? ৫-৮ টাকায় আলু? তবে এই যে কৃষক একবার মরলো সে কী আর দ্বিতীয়বার পিঁয়াজ-রসুন, আলুর চাষ করবে? ফলাফলে কী হচ্ছে, আমাদানি নির্ভরতা বাড়ছে। মধ্যসত্ত্বভোগীদের খপ্পরে পরে কৃষক কুপোকাত। অন্যদিকে খুচর বাজারে যেকোনো পণ্য কিনতে ক্রেতার ঘাম ছুটে যায়। সিন্ডিকেটের কবলে কাঁচামরিচও। মানুষ যাবে কই? আচ্ছা, কাঁচামরিচ ডলে ভন্ডদের পাছায় মেখে দেওয়া যায় না?
৭৫ টাকা দামের আলুর সময়ে সিঙ্গারার যা দাম ছিল এখন ১৫ টাকার আলুর কালে সিঙ্গার দাম কী কম? হোটেলে তরকারির মূল্য কমেছে। চিপসের দাম আগেরটাই আছে না? চিপস তো আলু-ই! ট্র্যাক ভাড়া, সমঝোতার চাঁদা, রাজস্ব- তা কী শতাংশে কম? কাজেই কৃষক মেরে আসলো ফায়দা কার? প্রতিবেশীসহ অনেক দেশই চায় না বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক। অন্যদিকে মধ্যসত্ত্বভোগী, সমঝোতার পক্ষ-বিপক্ষ এমনকি খোদ সরকারও কৃষকের পক্ষের না! অথচ সুষ্ঠু পরিকল্পনায় কৃষককে রক্ষা করা যেত। কৃষি হতো সম্মানজনক পেশা।
কৃষক ভালো না থাকলে বাংলাদেশের ভালো থাকা হবে না। দেশে উৎপাদিত পণ্যের এতো মূল্য কম- এসব ভালো আলামত নয়। দেশে উৎপাদিত সকল পণ্যের যথাযথ সংরক্ষনের উপায় বের করতে হবে। যখন দেশে উৎপাদিত পণ্য শেষ হয়ে যাবে তখন আমদানি করা পিঁয়াজ ৩০০ টাকা দরে, কাঁচামরিচ ৪০০ টাকা দরে, আলু আশি টাকা সেরে কিনে খেতে বাধ্য হতে হয়! অথচ এখন দেশের উৎপাদিত এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সমন্বয় করে চললে কৃষকও কিছু পয়সা পায়। আয় ভালো হওয়া মানে পরের বছর দ্বিগুণ উৎসাহে চাষে ঝাঁপিয়ে পড়া। খেসারত দিয়ে ঋণ কতদিন বয়ে চলা যাবে?

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন