দেলোয়ার জাহিদ
বাংলাদেশে দায়মুক্তির সংস্কৃতি (Culture of Impunity) দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত বহু অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা কার্যকর বিচারের আওতার বাইরে থেকে গেছে। এই নিবন্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়মুক্তির সংস্কৃতির উৎপত্তি, বিকাশ এবং এর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে দায়মুক্তি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে।
দায়মুক্তি বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও অপরাধীরা আইনি জবাবদিহি থেকে রক্ষা পায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট সূচক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবিত বিচারব্যবস্থা দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী করেছে। এর ফলে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হয়েছে।
. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ দ্রুত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হয়। বিশেষত ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিচারহীনতার একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী সামরিক শাসনামলেও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ উঠলেও সেসব ঘটনার অনেকগুলোর বিচার হয়নি। এই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিমূলক কাঠামোকে দুর্বল করে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দায়মুক্তির ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশে গত দুই দশকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে—
গুম
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
রাজনৈতিক সহিংসতা
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার
অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা প্রভাবিত হওয়ায় কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর প্রভাব
দায়মুক্তির সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে দুর্বল করে—
আইনের শাসন ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যদি আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, তবে আইনের সমতার নীতি ভেঙে পড়ে।
জবাবদিহি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন অপরাধ তদন্ত বা বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
জনআস্থা বিচারহীনতা দীর্ঘমেয়াদে জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে—
মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত
অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা
ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করা
এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নীতি-সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে নিম্নলিখিত নীতি-সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ—
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
পেশাদার ও স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বচ্ছ বিচার
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
উপসংহার
দায়মুক্তির সংস্কৃতি কোনো রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে এবং মানবাধিকার সুরক্ষাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন