নবীগঞ্জে দীর্ঘ ৪৬ বছরেও উদ্ধার হয়নি পুরান থানার অভ্যন্তরে থাকা দেবোত্তর সম্পত্তি কালী মন্দিরের ভূমি, হিন্দু জনসাধারনের মাঝে চাপা ক্ষোভ!

821
gb

উত্তম কুমার পাল হিমেল, নবীগঞ্জ(হবিগঞ্জ)থেকে ||

নবীগঞ্জে পুরাতন ও পরিত্যক্ত থানার ভুমির অভ্যন্তরে দখলে থাকা কালী বাড়ী ও কানাই লাল জিউর মন্দিরের ২৯ শতক ভূমি দীর্ঘ ৪৬ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও বহুবার চেষ্টা করে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে নবীগঞ্জের সকল হিন্দু জনসাধারনের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রকাশ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাক হানাদারবাহিনী ঐ মন্দিরের তৎকালীন সেবায়েত সুরেশ চৌধুরীকে গুলি করে হত্যার পর মন্দির ২ টি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। দেশ স্বাধীনের পর পরই নবীগঞ্জের হিন্দু স¤প্রদায়ের লোকজনের দেবোত্তর সম্পত্তি কালিবাড়ী ও কানাই লাল জিউড় আখড়ার ভুমি থানা কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে ঐ জায়গা ফেরত চেয়ে হিন্দু নেতৃবৃন্দ অনেক আবেদন করেও আখড়া দুটির ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বিষয়টিকে আইনগত জটিলতা হিসেবে অভিহিত করলেও বর্তমান ঐ দেবোত্তর ভুমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দেবোত্তর সম্পত্তির ঐ ভ‚মি উদ্ধারের কৌশল নিয়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ঘরোয়া বৈঠকের পাশা-পাশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। আজ ১৯শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার এ জায়গায় মন্দির থাকলে কালী দেবীর পুজা করা হতো। কিন্তু বেদখল থাকায় তা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তথ্যানুুসন্ধানে জানানায়,নবীগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র বরাক নদীর তীরে ডাকবাংলোর পাশ্ববর্ত্তী পুরাতন থানা কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরে বিদ্যমান নবীগঞ্জ মৌজার জেএল নং-৮৮,খতিয়ান নং ২০৮,দাগ নং-৩০৯ এর ১৪ শতক ভূমিতে শ্রী-শ্রী-কালিবাড়ি এবং খতিয়ান নং ৯২,দাগ নং-৩১০ এর ১৫ শতক ভূমিতে শ্রী-শ্রী-কানাই লাল আখড়া বিদ্যমান ছিল। ১৯৭১ সালের ১৫ আগষ্ঠ পাকহানাদার বাহিনী ঐ আখড়ার তৎকালীন সেবাইত সুরেশ চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে আখড়া দুটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে তা দখল করে নেয়। স্বাধীনতার পর পরই পুলিশ প্রশাসন সেখানে কাঠাতারের বেড়া দিয়ে আখড়ার ২৯ শতক ভ‚মিসহ ঐ জায়গায় তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অস্থায়ী থানা ক্যাম্পাস হিসাবে ব্যবহার করে যায়। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হবার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে নবীগঞ্জের হিন্দু নেতৃবৃন্দ ওই দেবোত্তর সম্পত্তি ফেরত চেয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন জানালে ও অদৃশ্য কারনে এর উদ্ধান কাজ এগিয়ে যায়নি। বিগত ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সংখ্যালঘু বান্ধব আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় গেলে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী থানা ভবন অন্যত্র সরিয়ে নবীগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কের দিকে নতুন ভবন নির্মান করা হলে কালীবাড়ী ও কানাই লাল জিউড় আখড়ার ভুমি পরিত্যক্ত অবস্থায় খালি পড়ে থাকে । উল্লেখিত ভুমিটুকু থানার প্রয়োজন না থাকায় খালি পড়ে থাকলেও ফেরত চেয়ে হিন্দু জনসাধারনওে পক্ষ থেকে আবেদন করলেও তা ফেরত দিতে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি পুলিশ প্রশাসন । পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেই ১৯৯৯ সালের জানুয়ারী মাসে থতানা ভবন উদ্বোধনের সময় নবীগঞ্জের কৃর্তি সন্তান তৎকালীণ অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াকে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে ঐ দেবোত্তর সম্পত্তি ফেরত চেয়ে বিষয়টি অবহিত করেন হিন্দু নেতৃবৃন্দ। লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন হিন্দুসমাজের পক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা মিহির কুমার রায় মিন্টু। কিন্তু এ পর্যন্তই উদ্ধার কাজ প্রক্রিয়ার কিছুই সুরাহা হয়নি। পরবর্তীতে বিগত ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীণ বিএনপি নেতা তৎকালীন সাবেক এমপি আলহাজ্ব শেখ সুজাত মিয়া স্বরামন্ত্রণালয়সহ দলের হাইকমান্ডকে ঘটনাটি অবহিত করেন। উর্ধŸতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক সার্ভেয়ার নিয়োগ করেন। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা থেকে প্রেরিত ১৪/১/ক-০৩ এবং ১৬০২/০৫ নং স্বারকে সহকারী কমিশনার ভূমির সমন্বয়ে ভূমির সীমনা নির্ধারনে দেবোত্তর সম্পত্তির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। তৎকালীন সার্ভেয়ার আহাদ আলী ০২/০১/৯৭ এর ০৩ (২) এর আলোকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে উল্লেখ করা হয়,এস.এ.রেকর্ডের মালিকানার ভিত্তিতে দুটি আখড়ার সেবাইতের নামে উল্লেখিত পরিমাণের ভূমি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। দুটি আখড়ার মোট ২৯ শতক ভূমি পুলিশ প্রশাসনের নিজস্ব ভূমির সঙ্গে একত্রীভুক্ত হয়ে বাউন্ডারী দেয়ালের অভ্যন্তরে রয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের নিকট ৩০৯ ও ৩১০ দাগের ভূমির স্বপক্ষে কোন কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।
তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর নবীগঞ্জ থানা ভবন ঐ জায়গা থেকে সরিয়ে পাশ্ববর্তী অন্য জায়গায় নতুন ভবন নির্মান করে স্থান্তর করা হয়েছে। ফলে ঐ খালি জায়গা অব্যবহৃত হিসাবে পড়ে রয়েছে। যেহেতু ঐ জায়গা খালি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেহেতু নবীগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দেবোত্তর সম্পত্তি টুকু ফেরত পাবার জন্য পুনরায় জোর চেষ্টা করেন। উক্ত জায়গা পুনরায় ফেরত চেয়ে উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক কালীপদ ভট্রাচার্য্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,ধর্মমন্ত্রণালয়, স্বরামন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রনালয়ে লিখিত আবেদন প্রেরন করেন। কিন্তু আবেদনপত্র প্রেরন করলে প্রধানমন্ত্রী ও ভুমি মন্ত্রনালয় থেকে কয়েকবার আবেদনকৃত ভুমির উপর সরজমিনে তদন্ত প্রতিবেদন চাইলেও আমলাতান্তিক জটিলতার কারনে প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রনালয়ে গিয়ে ফাইল চাপা পড়ে থাকে। যার ফলে মন্দির দুটির ভুমি উদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ বর্তমান সরকারের তৎকালীন মৎস ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস পোনামাছ অবমুক্ত করার জন্য সরকারী সফরে নবীগঞ্জে আসলে পুনরায় ঐ দেবোত্তর সম্পত্তি ফেরত চেয়ে হিন্দুÑবৌদ্ধÑখ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিহির কুমার রায় মিন্টু লিখিত আবেদন প্রেরন করেন। কিন্তু তাও এ পর্যন্তুই সীমাবদ্ধ থাকে। ধর্মীয় প্রতিষ্টান দুটির ২৯ শতক ভুমি উদ্ধারের দাবীতে নবীগঞ্জ বিগত ২০১১ সালের ৩১ শে অক্টোবর নবীগঞ্জ নতুন বাজার মোড়ে নবীগঞ্জের হিন্দু জনসাধারনের উদ্যোগে সকল ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে এক স্নরনকালের সবচেয়ে বড় মানববন্ধন অনুষ্টিত হয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক কালীপদ ভট্রাচার্য্য ও যুগ্ম সাধারন সম্পাদক প্রভাষক উত্তম কুমার পাল হিমেল এর যৌথ স্বাক্ষরে পুনরায় বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর আবেদন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীসহ অন্যান্য স্থানে আবেদনের অনুলিপি প্রেরন করেন। কিন্তু অদ্যবধি এর কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী কর্তৃক ধ্বংসকৃত ও বর্তমানে নবীগঞ্জ থানা পুলিশের দখলে থাকা ঐ কালীবাড়ী ও কানাই লাল জিউড় আখড়ার ভুমি উদ্ধারের জন্য অধুনালুপ্ত কালীবাড়ীর স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিকি কালীপুজা বিগত ১ যুগ ধরে পাশ্ববর্তী ডাকবাংরো প্রাঙ্গনে অনুষ্টিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এ খালি জায়গাটুকু যেহেতু নবীগঞ্জ থানাপুলিশের কোন কাজে আসছে না। তাই মন্দিরের স্মৃতি রক্ষার্থে ঐ জায়গা ফেরত পাওয়া নবীগঞ্জের সকল মানুষের এখন প্রাণের দাবীতে পরিনত হয়েছে।
উপজেলা মানবাধিকার কমিশনের সাধারন সম্পাদক ও উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক উত্তম কুমার পাল হিমেল বলেন, হিন্দু স¤প্রদায়ের ন্যার্য্য দাবী কালীবাড়ী ও কানাই লাল জিউড় আখড়ার ভুমিটুকুুু ফেরত পাওয়া। বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু বান্ধব সরকার তাই সরকারের কাছে এই দেবোত্তর ভুমি ফেরত দেওয়ার জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি।
স্বাধীনতার পর বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার এ নিয়ে ৪ বার ক্ষতায় আসলেও অদ্যবধি দেবোত্তর সম্পত্তির এ জায়গাটুকু ফেরত না দেওয়া খুবই দুঃখজনক।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট রাজীব কুমার দে তাপস বলেন, যুক্তিসঙ্গত কারনেই সরকারের উচিত ঐ ধর্মীয় মন্দিরের এ জায়গাটুকু ফেরত দেওয়া। দীর্ঘ ৪৬ বছরেও ঐ দেবোত্তর সম্পত্তি মন্দিরের ভ‚মি উদ্ধারের জন্য একাধিকবার দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন প্রেরন করলেও কার্যকরী কোন পদক্ষেপ না হওয়ায় নবীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭৫ হাজার হিন্দু জনসাধারনের মাঝে দিন দিন চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে ।
উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক মুজিবুর রহমান শেফু বলেন,আখড়ার নামে রেকর্ড থাকা সত্তে¡ও দীর্ঘদিন যাবত এ ভুমি উদ্ধার হচ্ছে না। বিগত দিনেও এ ভুমি উদ্ধারের জন্য সকলের সাথে ছিলাম। তাই এ ভুমি উদ্ধার নবীগঞ্জের মানুষের ন্যায্য দাবী আদায়ে সবসময় সহযোগীতা করব।
নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সাইফুল জাহান চৌধুরী বলেন,পাকবাহিনী কর্তৃক ধ্বংসকৃত কালীবাড়ী ও কানাই লাল জিউড় আখড়ার ভুমি ফেরত দেওয়া সময়ের যৌক্তিক দাবী। আমি ভুমি মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রীকে এ ভুমি ছাড় দিয়ে আখড়া কমিটির কাছে হস্তান্তর করার জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি।
উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদেও সভাপতি নারায়ন রায় বলেন,স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকারের আমলে আমাদের দেবোত্তর সম্পত্তির জায়গা ফেরত চেয়ে অনেক আবেদন করা হয়েছে। অনেক বার সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিদের্শে জায়গা সার্ভে ও হয়েছে। কিন্তু অদ্যবধি কোন সুফল পাইনি।
নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরী বলেন, নবীগঞ্জের এ দেবোত্তর সম্পত্তির ভুমি উদ্ধারের জন্য আমি বিগত দিনে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নিকট বলেছি প্রয়োজনে আবারো যাবো। এ জায়গা উদ্ধারের জন্য সবসময়ই আমার সর্বাাত্বক সহযোগীতা থাকবে।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুশফিক হোসেন চৌধুরী বলেন,নীতিগত ভাবে আইনী প্রক্রিয়ায় এর সমাধান জরুরী ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনের এমপি এম এ মুনিম চৌধুরী বাবু বলেন,উল্লেখিত জায়গাটুকু ফেরত পাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের যৌক্তিক দাবী। তাই নীতিগতভাবে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মন্দিরের জায়গা ফেরত দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে প্রয়োজনে সংসদে দাবী তুলব।