বৈষম্য গ্রেডে নয়- চরিত্রে

gbn

আপনি বোধহয় ভাবেন— গ্রেডে গ্রেডে বৈষম্য! আমলা-কামলায় বৈষম্য? না। বৈষম্য চিরকাল মানুষে মানুষে। রাতেও কোনো কোনো বড় কর্তার বাসায় ডিমভাজি, ডালের মেন্যু ছিল। কোনো কোনো পুলিশ কঠোর পরিশ্রমের পরে নিরামিষ সব্জি, পরোটা খেয়ে শুতে যেতে বাধ্য হয়েছে। কোনো কোনো মাস্টার শীতের রাতে ঠান্ডা ভাতের সাথে পেঁয়াজ-মরিচও উপায়হীন হয়ে খেয়েছে। 

 

আবার কোনো কোনো কেরানি ওয়েস্টিনের হাঁসের মাংসে কব্জি ডুবিয়েছে। কারো কারো সুরাহিও ছিল। গ্রেডে বেতন হয়, যোগ্যতায় সম্মান হয়; কিন্তু আয় নির্ধারিত হয় চাতুর্যে। কত মানুষ কত অসৎ পথে রোজগার করে কোটিপতি হয়েছে— ইয়ত্তা আছে? আবার কোনো কোনো বড় সাহেব সামনের মাসে কীভাবে সন্তানের টিউশন ফি জোগাবেন, সামাজিকতা রক্ষা করবেন এবং সংসার চালাবেন— তা নিয়ে ঘাম ঝরিয়ে ভাবেন। কারো কারো কাছে ৩১ দিনের মাস বছরের মতোই দীর্ঘ! 

 

আমরা স্বভাবতই অন্যের সঙ্গে সবকিছুতে তুলনা করি। এই তুলনায় পিছিয়ে গেলে মন খারাপ করি, এগিয়ে থাকলে অহংকারে মরি। তুলনা করি সম্পদের, ক্ষমতা ও লৌকিক সম্মানের। বৈধতার তুলনা, মনের স্বপ্ন ও সুখের তুলনা আমাদের স্বভাবে নেই। গাড়ি-বাড়িতে কে কতটা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, গোপন কামাইয়ে কে কতটা মেতেছে— তা নিয়েই চিরকাল আলাপ করি। যোগ্যতার সঙ্গে সততাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতাও যে অনস্বীকার্য— এই বোধটুকুও আমাদের অনেকের মধ্যে থাকে না। পয়সা পেলেই হলো— তা কি বিষ্ঠারূপে এলো কি না, ভাবি না!

 

একই পেশায় থেকে সবাই এক রকম হবে না। কেউ দুনিয়ায় কেবল পয়সাই চেনে—উৎসের বৈধতা-অবৈধতা তার কাছে কোনো ব্যাপারই না। আবার কেউ অঢেল হাতানোর সুযোগের মুখে থেকেও লোভের দরজা বন্ধ করে রাখে। অবৈধ অর্থ শুধু নয়, বরং অনৈতিক ক্ষমতাকেও মৃত্যু মনে করে। একই পদে চাকরি করে কারো বাড়ি-গাড়ি কিংবা নারীরও অভাব নেই; বৈধ সম্পর্ক জানবেই না যে অবৈধতার অতল কত! আবার সেই একই বেতনে থেকে কেউ মাস চালাতে হিমশিম খায়। তাদের কারো কারো সঙ্গী হিসেবি ও বুদ্ধিমান বলে সংসারটা সামাজিক নিয়মে টিকে থাকে; নয়তো বেতন ফুরানোর পরে রাতের আঁধারে বেবিট্যাক্সি চালাতে হতো। বদলা দিতে হতো ছুটির দিনে।

 

পাশাপাশি ডেস্কে বসা সহকর্মীর ফ্ল্যাট-প্লট হয়েছে— তাতে যেন মন খারাপ না হয়। সে যে ফাইল জিম্মি করে অর্থ হাতায়, তা সম্পদ নয়; বরং বিষ। ইতোমধ্যেই তার মস্তিষ্কে ক্যানসার ঢুকে গেছে। যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ঠিকঠাক না পড়িয়ে প্রাইভেটে ‘ভালো শিক্ষক’ সেজে ঘরদোর পাকা করেছে, সে আসলে দুনিয়ায় নরক নির্মাণ করেছে। যিনি যে পেশায় আছেন, সেটাকে যদি বেতনের বিনিময়ের দায়িত্ব মনে না করে ঘুষের বিনিময়ের সেবায় পরিণত করেন, তবে তিনি আত্মিক সুখ হারিয়েছেন। অবৈধ পয়সা সবার আগে মনে ব্যাধি সৃষ্টি করে। ঘুমাতে দেয় না তাকে। উৎকণ্ঠা আর সংশয়ে জীবন অশান্তির অনলে পুড়ে।

 

মানুষে মানুষে এই বৈষম্য চিরকাল থাকবে। সমান যোগ্যতা থেকেও কেউ হাঁটবে, কেউ রিকশা ডাকবে, কেউ গাড়িতে চলবে, আর কেউ উড়োজাহাজে উড়বে। মন খারাপ করবেন না। যার কম, তার হিসাবও কম; যার বেশি, তার আটকে যাওয়ার আশঙ্কাও বেশি। কার কত আছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কে কীভাবে অর্জন করেছে। হালালের সঙ্গে যদি হারাম মিশে যায়, তবে ভোগ ছাড়বে না। শরীরের রোগের চেয়ে মনের রোগ আরও ভয়ংকর। মরণের আগে যারা বারবার মরে, তাদের জন্য করুণা হয়। অথচ সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য খুব বেশি পয়সা লাগে না।

 

পয়সার শক্তি মানুষকে ধোঁকায় ফেলে। মনে করায়— টাকায় যেন মানুষ বাঁচে! চিকিৎসা, ভোগ—সবই তো অর্থের খেলা! আসলে কি তাই? পয়সা থাকলে কি বেশিদিন বাঁচা যায়? বিলিয়নিয়াররা তবে তো কবরের পথযাত্রী হতো না। রাতে কী খেয়ে বিছানায় গেলেন, বিছানা কতটা নরম— সেসবের চেয়েও বেশি বিবেচ্য, ঘুমটা কতটা মোলায়েম হলো। যে পয়সা মানসিক শান্তির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা পরিত্যাজ্য হোক। অবৈধ উৎস, অন্যায় অর্জন দুনিয়ায় কাউকে কাউকে ভালো রাখতে পারে; কিন্তু মরে দেখো— সময়টা ভালো যাবে না। কারো অধিকার হরণ করে আয়েশময় জীবন— হবে না।

 

যে ঋণে মানুষ জড়িয়ে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করলেও কোনো না কোনোভাবে প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। সময় আবর্তিত হচ্ছে— গুণগতভাবে অপরিবর্তিত থেকে। আজ সময় পক্ষে যাচ্ছে মানে আগামীকালের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখো। আজ ঘুষ দিয়ে, সুপারিশ এনে পার পেয়ে যেতে পার; কিন্তু আগামীকাল যাদের সময়, তারা অন্যায়কে পিষে দেয়। কবরের মাটি দুনিয়ার মাটির ওপরের বিল্ডিংয়ের উচ্চতা মাপে না— ভালো আমল খোঁজে। যখন মন্দ ছাড়া কিছুই পাবে না, তখন তোমার জন্য সবকিছুই অন্ধ হয়ে যাবে। না খেয়ে থাকাও মঙ্গল— অন্যায় থেকে। মানুষ, ভুল পথে পা ফেলো না।

 

মানুষ, অবৈধভাবে অর্জিত পয়সা খেয়ো না। জীবন হাজার বছরের লম্বা না। বাঁচতে পারার দিনগুলোর প্রায় সবগুলোরই ব্যবহার ফুরিয়ে এসেছে। সময় ও সুযোগ অপব্যবহারকারীদের জন্য সামনে দুর্দিন। কারো ওপর অহেতুক বলপ্রয়োগ করলে, কাউকে একটি কথায় কষ্ট দিলে, কিংবা কারো সঙ্গে অন্যায়ভাবে চোখ রাঙিয়ে কথা বললেও হিসাব দিতে হবে। পরকালে? অবশ্যই। তবে অধিকাংশ ফয়সালা হবে ইহকালেই। প্রত্যেকেই নিজের ও অধীনদের ব্যাপারে দায়বদ্ধ। মানুষকে ঠকিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে আপন লোকদের আরাম-আয়েশে রাখলেও সময়কালে কেউ তোমার কাজের দায় নেবে না। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হও।

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।  

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন