রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় কী? সৌদি, কুয়েত, বাহরাইন কিংবা এ অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো আজ ইসরাইলের মিত্র হিসেবে কাজ করছে। তাদের প্রতিপক্ষ কে? একা ইরান। আরব বিশ্বের যে দেশগুলো আমেরিকাকে প্রভু এবং ইসরাইলকে বন্ধু ভাবছে তাদের জন্য ভবিষ্যতের ইতিহাসের পাতায় পাতায় কাপুরুষতার দাগ লেগেই গেল। মুসলিম জাহান কোন ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করছে? যারা ফিলিস্তিনের হাজার হাজার নারী ও শিশুকে হত্যা করেছে, যে ইহুদি আশ্রিত হয়ে গৃহস্থের সবকিছু দখল করে নিয়েছে। যারা যুগের পর যুগ অত্যাচারের খড়গ চাপিয়ে দিয়েছে।
সৌদিসহ আরবরা আজ আমেরিকার মন্ত্রণায় জালেমের পক্ষাবলম্বন করছে। যে ইরানকে তারা নিজেদের জন্য হুমকি মনে করছে সেই ইরান কখনোই কারো পদলেহন করেনি। আত্মাভিমানের এই অনন্য দৃষ্টান্তকে যারা থামিয়ে দিতে চায় তারা আসলে নতুন টার্গেট খুঁজছে। বলা যায়, ইতোমধ্যেই ইরানের একপ্রকার পতন হয়েই গেছে। তবে ইরান নিজে মরতে মরতে আরও অনেককে মেরে যাবে। তাদের সামনে পথই একটা- মরো নয় মারো। তারপরে কি আমেরিকা ও ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবে? তাদের চোখ শুধু আরবদের খাবারের প্লেটে কিংবা সুউচ্চ অট্টালিকাতেই আটকে নেই। ইসরাইল সবার ভূমি দখল করতে চেষ্টা করবে। আমেরিকা দখল করবে ভূমির গভীরের তরল শক্তি। মরুভূমির নিচে থাকা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যারেল তেল-গ্যাসের লোভ তারা কোনোদিনও ছাড়বে না। আমেরিকার কখনোই স্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু নাই। স্বার্থপরতাই তাদের বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতার কূটনীতি নির্ধারণ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের যারা যারা ইসরাইলের মিত্র তারা বিবেকের কাছে কী কৈফিয়ত দেবে? ইরানের দেড় শতাধিক স্কুল শিশু একটা বোমাতেই নিথর হলো। দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা ফিলিস্তিনি নিধনে যারা হাত পাকিয়েছে, তাদের যারা এখানে ডেকে এনেছে, উসকানি দিয়ে এবং হত্যাকান্ড ঘটাতে প্রলুব্ধ করেছে তাদের তো স্রষ্টা আছে? যদি থেকে থাকে তবে কী জবাব দেবে ওরা? ভাইয়ের উত্থানকে হুমকি মনে করে যারা বাইরের বুদ্ধিজীবী ডেকে করে, মস্তান ভাড়া করে তাদের উদ্দেশ্য ভালো? মুসলিম দেশের ভূমি ব্যবহার করে ইরান গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে- ইসরাইল ও আমেরিকানদের চেয়ে এতে মুসলিম দেশগুলো কম দায়ী? ফিলিস্তিনের ফুলের মতো শিশু, ইরানের নিরীহ মা-বোন হত্যার কৈফিয়ত বিবেক দাবি করবে না?
ইতিহাসের দু'দুটো বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি তালিকা দেখে তাদের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য পাঠ করা যায়। এবারের যুদ্ধে যারা যারা সন্ধি পাতালো তারা সবাই ইসরাইল নামক শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েছে। ভাইয়ের রক্ত ঝরাতে ডেকে আনা হয়েছে শত্রুপক্ষের শক্তি। মঙ্গল হবে? কারো না কারো পরাজয়ের পরে যুদ্ধ তো একদিন থামবে। বাতাসের বয়ে চলার মতো যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার অফুরান শক্তি কারোরই নাই। মিসাইল, ড্রোন, বোমা কিংবা বারুদ একটা পর্যায়ে এসে ফুরাবে। বিমান কিংবা বৈমানিক থাকলেও বিকল হবে বৈমানিকের মস্তিষ্ক। কাউকে কাউকে মস্তিষ্কের মধ্যকার সাইকো ভাব সরায়ে বিবেক ডেকে তুলবে। ততক্ষণে জাতীয়তাবাদ ও স্বার্থের মিছিলে যে দাগ লেগে যাবে তা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমদের থেকে আর কখনোই আলাদা করা যাবে না।
কে কার বন্ধুতে পরিণত হলো এবং শত্রুতায় বিগড়ে গেলো তা সময় একসময় মূল্যায়ন করবেই। ভোগবাদিতায় ডুবে থাকা আরব শেখদের সুদিন ফুরিয়ে যেতে বেশিদিন লাগবে না। তাদের অধীনে থাকা সম্পদই তাদের পতনের কারণ হবে। ওই যে, আপণা মাংসের হরিণা বৈরী! ফিলিস্তিনি ও ইরানিয়দের প্রতি এমন অনাচারে যারা দুঃখ পায় না তাদের পচন ভেবে মনে বেদনাই জাগে। মানুষ এমন করে বিবেকহীন হতে পারে? আকৃতিতে মানুষ থেকে লাভ কী যদি ভেতরের পশুকে বলিদান করা না যায়। আফসোস মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের জন্য। পশ্চিমা মোনাফেকদের পাপেটে পরিণত হয়ে আজ তারা যাদেরকে হত্যায় মেতে উঠলে তারাও আল্লাহকেই স্রষ্টা মানে। যুগে যুগে মীরজাফরদের ক্ষতচিহ্ন থেকে যায়। যারা মানুষ তাদেরকে ডেকে বলে, অমানুষদের থেকে বহুদূরে থাকবে।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন