নারী দি-বসের প্রাসঙ্গিক কথা

gbn

।এক।

নারী দিবসে আজ আসমা সাদিয়া রুনার কথাই লিখি। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষিকা সহকর্মীদের ষড়যন্ত্রে সম্প্রতি নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন বিভাগের কর্মচারীর হাতে। রেখে গেছেন চারটি ফুটফুটে মেয়ে।  

 

রুনার কথায় বিস্তারিতভাবে যাওয়ার আগে সারা বাংলাদেশের নারীদের জন্য অনিরাপদ সকল প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে নেই। অশিক্ষিত সমাজের মধ্যে যে নারীরা থাকে তাদের জীবন বোঝার আগে শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা নারীদের চিত্র আঁকি। সহকর্মীদের আলাপের বিষয়বস্তুতে নারী সহকর্মী নাই- পেয়েছেন? কটূক্তি, দম্ভোক্তির অনেকটা নারীকে ঘিরে। মোটামুটি যতভাবে চাপে রাখা যায়, পিষে দেওয়া যায়- তা নারী সহকর্মীদের সহ্য করতে হয়। অনেক কর্মক্ষেত্রেই নারীদের জন্য পরিবেশ ভালো। তবে যেখানে খারাপ সেখানে বেজায় খারাপ। দলাদলি কিংবা কোরাম নাই এমন ফোরামের আভাস ছাড়া কর্মক্ষেত্র খুব কমই আছে। সেখানেও ভিক্টিম নারী। 

 

কত উচ্চশিক্ষিত দেখেছি যাদের জিহ্বা নারীদের জন্য কোনো সম্মানিত শব্দ প্রসব করে না। অনেকের শব্দ ও ইশারায় নারীদের জন্য কুরুচির আভাস। হয়তো মেয়ের বয়সী নয়তো মায়ের বয়সী সহকর্মী- তবুও কু-শব্দের হুলিয়া ফুটতেই থাকে। নারীকে হেয় করে যেন বিশাল কিছু অর্জন হয়! এমনও তো অফিস কক্ষ আছে যেখানে পুরুষ সহকর্মীদের অশ্লীল শব্দের তুবড়িতে নারী সহকর্মীদের বসাই অসম্ভব। নারীদের প্রতি অসভ্য ইঙ্গিত আজও কতিপয় শিক্ষিতদের মাথা থেকে যায়নি। কোথাও কোথাও নির্যাতন ও নিপীড়নের তীর নারীদের জন্য উচ্চকিত করাই থাকে। 

 

চলতি পথে, ঘরে-বাইরে নারী শব্দটিকে কেউ কেউ গালির প্রতিশব্দে ব্যবহার করে! সাহিত্যে আজও খানকি মাগী, বেশ্যা মাগী লেখা হয়! নারীকে পণ্য করে একদল আজও তাদের ফায়দা কুড়ায়। নারীকে গালি দিয়ে তোলে তৃপ্তির ঢেঁকুর। অথচ যারা নারীকে সম্মান দিতে জানে না তারা পিতা, স্বামী এবং পুত্র হিসেবে ব্যর্থ। বাংলার কোনো কোনো ঘরে নারী আজও ননীর পুতুল! নারীর মতামত আজও উপেক্ষিত। নারীর  স্বাধীনতা এখনও চার দেয়ালে বন্দী।

 

এবার ফিরি নারীদের প্রতিরূপ, পরিণতি রুনায়। কতিপয় সহকর্মীর অন্যায়-দুর্নীতির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন বলে সহকর্মীদের ষড়যন্ত্রে ইবিতে নিজ বিভাগেই জীবন দিতে হলো তাকে। স্বামী তার স্ত্রীকে হারিয়ে বেঘোরে মুর্ছা যাচ্ছেন, আর্তনাদ করে কাঁদছেন। বড় কন্যা চিৎকার করে বলছে, এখন আমাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে কে? ছোট তিন মেয়ের যা বয়স তাতে ওরা মা হারানোর ব্যথা বুঝতে পারার বয়সেই পৌঁছাতে পারেনি। অথচ এই মেয়েগুলোর মাকে পাশের ডেস্কে বসা সহকর্মীদের চক্রান্তে জীবন হারাতে হলো। এই তো নারীর চিত্র, সারা বাংলার নারীর দুর্দশা। 

 

।।দুই।।

যে কথা আজও বলতেই হবে। নারী প্রগতিতে, নারীর স্বাধীনতায় বড় বাঁধা এখনো নারী-ই। নারী দি-বস বলতে যাদের বুঝি তারা নিশ্চয়ই এরা নয়- 

 

আরেকটা সংসার ভাঙবে জেনেও, অশান্তি হবে জেনেও যে নারীরা বিবাহিত পুরুষদের সাথে পরকীয়ায় জড়ায়, সেই নারীদের জন্য এই নারী দিবস? 

 

★ 

বোনকে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য নিজের যে ভাইকে তার বউ বুদ্ধি দেয়, সেই নারীর জন্য এই দিবস?  

 

মেয়ে একটু বড় হলেই যে মা পড়াশুনা বন্ধ করে বাবাকে মেয়ে বিয়ে দিতে প্ররোচিত করে কিংবা যে মা কন্যার উচ্চশিক্ষার প্রতিবন্ধক হয়ে দাাঁড়ায়, সেই নারীর জন্য এই দিবস?  

 

যে মা নিজেই তার কন্যা সন্তানকে এবং পুত্র সন্তানকে সমান চোখে দেখে না, কন্যাকে বোঝা আর পুত্রকে হিরের টুকরো মনে করে,, সেই মায়ের জন্য এই নারী দিবস?  

 

যে নারী অন্য নারীর রূপ-গুণ এবং ঐশ্বর্য দেখে ঈর্ষায় জ্বলে-পুড়ে মরে, সেই নারীর জন্য আজকের এই দিবস?  

 

যে নারী আরেকজন নারীর উন্নতির প্রতিবন্ধক হয়, উলঙ্গ নিন্দা করে, টেনে ধরে, খামচে ফেলে দিতে চায়, সেই নারীদের জন্য আজকের এই নারী দিবস?  

 

যে নারী শাশুড়িকে সহ্য করতে পারে না, যে নারী পুত্রবধুকে সীমাহীন যন্ত্রনা দেয়, যে নারী অন্য নারীদের বন্ধু হতে পারে না, সেই নারীদের জন্য আজকের এই দিবস?  

 

যে নারী তার নারী সহকর্মীকে দু’চোখে দেখতে পারে না, চুলোচুলি অবস্থায় পৌঁছে, তার জন্য আজকের এই দিবস? 

 

।।।তিন।।।

যদি নারীর সাথে পুরুষের দ্বন্দ্ব,  সম-অধিকারের ঘোচাতে এই দিবসের আয়োজন হয় তবে ধীরে ধীরে এই দিবসের প্রাসঙ্গিকতা কমে যাবে। কেননা নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। পুরুষ নারীর সামনে নাকি পেছনে তা ঠিক করতে বড়জোর একযুগ লাগবে! ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষার খাতা সে কথাই বলে! কিন্তু নারী প্রগতিতে হুমকি যে নারী-সেই নারীদের মধ্যে কোন পক্ষের জন্য আজকের এই দিবস? কোন নারীই-বা দি-বস!- তাও আলোচনায় থাকা উচিত। 

 

নারী দিবসের অঙ্গীকার সমাজটাকে নারীদের জন্য নিরাপদ করা। আজও সমাজে নারী ও শিশুদের ধর্ষিতা হওয়ার খবর পড়তে হয়। নারী নির্যাতনের চিত্র ভয়ংকরভাবে সামনে আসে। ঘরে-বাইরে নারী নিপীড়নের, ইভটিজিং এর এবং আ্যাবিউসিয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এগুলো থামাতে না পারলে সারা জীবন কেবল নারী দিবস পালনেই নারীর অধিকার, নারীর প্রতি অঙ্গীকার সীমাবদ্ধ থাকবে। আমাদের নারীদের নারী দি-বস হয়ে ওঠা হবে না।

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন