রিপোর্টার,সাতক্ষীরা //
পবিত্র এই রমজানের মাস জুড়ে প্রতি বছরের মতো এবারও সাতক্ষীরার নলতায় আহছানিয়া মিশনের উদ্যোগে দেশের অন্যতম বৃহত্তর ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে নলতা ওরছ শরিফ চত্বরে। বাংলাদেশের মধ্যে সব থেকে বড় ইফতারের আয়োজন বলে দাবি আয়োজকদের। এদিকে দেশের সর্ববৃহৎ এই ইফতার মাহফিলে অংশ নিতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন রোজাদার মানুষেরা। মঙ্গলবার (১২ মার্চ) সকাল থেকেই শুরু হয়েছে ইফতার তৈরির প্রস্তুতি।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) নলতায় গিয়ে দেখা গেছে,সকাল থেকেই স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যস্ত ইফতার সামগ্রী প্রস্ততের কাজে। কেউ তৈরী করছেন সিংগাড়া, কেউ দুধের ফিন্নি। কেউবা ব্যস্ত ছোলা ও ডিম সিদ্ধ করার কাজে। উদ্দেশ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই ৬ হাজার মানুষের ইফতার তৈরীর কাজ শেষ করা। নির্ধারিত সময় ইফতার তৈরি শেষে এবার বন্টনের পালা। সুন্দর ও সুচারু ভাবে স্বেচ্ছা শ্রমে এই ইফতার বন্টনের কাজেও নিয়োজিত আছে আড়াইশ থেকে তিনশ স্বেচ্ছাসেবি। যারা প্রত্যেকে স্বেচ্ছা শ্রমে রোজাদারদের সেবায় ইফতার বন্টনের কাজে অংশ নিতে পেরে খুশি।
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা পীর এ কামেল আলহাজ খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর ভক্তরা হাজার হাজার মানুষের এই ইফতার তৈরি থেকে পরিবেশন করে আত্মতৃপ্তির সঙ্গে আখেরাতে তাদের পথ সুগমের প্রত্যাশা করে। এখনে নেই কোনো ভেদাভেদ। এমনি সোয়াবের প্রত্যাশায় পীর ভক্ত ভাই বোনেরা অনুদান দিয়ে ইফতারে অংশ নিয়ে থাকেন বলে জানিয়েছে মিশন কর্তৃপক্ষ।
তবে অনেকের কাছে আশ্চার্য়ের বিষয় প্রতিদিন কমবেশি পাঁচ হাজার ইফতারের প্লেটে খাদ্য পরিবেশন করতে এতটুকু বিশৃঙ্খলা হয় না।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা পীর এ কামেল আলহাজ খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর জন্মভূমি নলতা গ্রামে তিনি ১৯৩৫ সালের ১৫ মার্চ নলতা আহছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই রমজান মাসে ক্ষুদ্র পরিসরে ইফতারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই মহতী উদ্যোগ। পরবর্তীতে সময়ের পরিক্রমায় ওই আয়োজনের প্রসার বড় হতে থাকে। খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তরা প্রতি বছর এই আয়োজন অব্যাহত রেখেছেন, যা বর্তমান সময়ে দেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ ইফতার মাহফিল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
করোনা পূর্ববর্তী এই নলতা আহছানিয়া মিশনের উদ্যোগে একসঙ্গে ১০ হাজার রোজাদারকে ইফতার করানো হত। তবে করোনায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর তা নেমে পাঁচ থেকে সাত হাজারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও ইফতার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এতিমখানা, মসজিদ ও বিভিন্ন অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়ে থাকে।
কর্মরত বাবুর্চিদের কেউ ৩৫ বছর, কেউবা ২৫ বছর আহছানিয়া মিশনের কাজ করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে জানান, প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে তাদের ইফতার তৈরির কাজ শুরু হয়। আর নির্ধাতি সময়ে ডিম, ছোলা, চিড়া, কলা আর ফিন্নি সহ সমস্ত রান্না শেষ করতে বিকেল ৫টা বেজে যায়। এত বড় আয়োজনে তাদের মধ্যে নেই কোন ভেদাভেদ। পীরের ভক্ত হিসেবে আল্লহর সন্তষ্টির জন্যই তারা আনান্দের সাথে করেন তারা।
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের নির্বাহী সদস্য আলহাজ মো. ইউনুছ জানান, পীর কেবলা বেঁচে থাকতেই রমজান মাসে এখানে ইফতারের ছোট পরিসরে আয়োজন করা হতো। উনার মৃত্যুর পর তার একনিষ্ঠ সহচর সাবেক খাদেম মৃত আলহাজ মৌলভী আনছার উদ্দীন আরো বড় পরিসরে এ ইফতারের আজোন করেন। ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণ করার জন্য ঢাকা নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে আসে ভক্তরা।
অনুদানে অংশ নিয়ে সোয়াবের ভাগিদার হতে চান তারা। তাদের মতে এশিয়া মহাদেশের একটি বৃহৎ ইফতার মাহফিলে ধনী গরিব চোট বড়দের নিয়ে কারো না কারো অছিলায় দোয়া কবুল হবে। আর এই দোয়ার ওছিলায় তারা নাজাত পাওয়ার আসায় এখানে আসে।
তারা একই কাতারে বসে সুশৃঙ্খলভাবে একই মানের ইফতারি করে থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার অনেক দূর দূরান্ত থেকে সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবীরা এখানে ইফতার করে থাকেন। আর জুম্মার নামাজ আদায় শেষে ইফতার করে বাড়ি ফিরে যান। এই একটি মাস সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে পবিত্রতার সঙ্গে পরিছন্ন পরিবেশে এখানে ইফতার করানো হয় বলে জানান স্বেচ্ছাসেবকরা।
নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, করোনার অগে এখানে ১০ হাজার মানুষের জন্য এখানে ইফতারের ব্যবস্থা করা হতো। করোনার জন্য দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত বছর থেকে আবারও এই ইফতার পরিবেশনের কাজ শুরু হয়। তারপরও আগের মতো বড় না হলেও এখনও প্রতিদিন ৫ হাজার সাড়ে ৫ হাজার মানুষের মাছে দেয়া এই ইফতার পার্টি দেশের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তর উল্লেখ করে জানান, পীর ভক্ত ভাইবোনেরা এ বৃহৎ আয়োজনে অংশ নেন। নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের এই বৃহৎ ইফতারের আয়োজনে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয় বলে মিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় নয় সামাজিক সম্প্রীতিরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর সাতক্ষীরাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে হাজারো মানুষ নলতা শরীফে সমবেত হন। রমজানজুড়ে এ গণ-ইফতার নলতা শরীফকে পরিণত করে এক বৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনস্থলে।##

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন