লন্ডনে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও নীরব গণহত্যা’ শীর্ষক সমাবেশ : হত্যাযজ্ঞ বন্ধে বৃটিশ সরকারকে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান

307
gb

                                                               আধঘণ্টায় ১৫৫ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ 

লন্ডন ||

১০ সেপ্টেম্বর :  লন্ডন মুসলিম সেন্টারে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও নীরব গণহত্যা’ শীর্ষক আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা রাখাইনে নির্মম হত্যাযজ্ঞ বন্ধে মায়ানমার সরকারের উপর জরুরী ভিত্তিতে চাপ সৃষ্টি করতে বৃটিশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে লন্ডন মুসলিম সেন্টারের নিচতলায় শতশত বিক্ষুব্ধ জনতার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সমাবেশে এ আহবান জানানো হয়। রোহিঙ্গা মাইনোরিটি ক্রাইসিস গ্রুপ, বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে, মুসিলম ভয়েসেস ও মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব বৃটেনের যৌথ উদ্যোগে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা বৃটেনের সর্বস্তরের নাগরিককে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার সংসদ সদস্যের কাছে চিঠি লেখার আহবান জানান। তাঁরা এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক কমিউনিটির আশু হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, একটি ভূখন্ডের মুসলিম সম্প্রদায়কে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ বিশ্ববাসী নীরব দর্শকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে। বক্তারা মিয়ানমার নেত্রী অং সাং সুচির ভুমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, তিনি যখন কারাবন্দী ছিলেন তখন তার মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক কমিউনিটি আন্দোলন করেছে। কিন্তু আজ তাঁর নেতৃত্বে মায়ানমারে গণহত্যা চলছে। বক্তারা মায়ানমার সরকারকে দেয়া বৃটিশ সরকারের সবধরনের সুযোগ-সুবিধা বন্ধের দাবী জানান।

মুসলিম ভয়েস এর চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ ফলিক ও আনিকা মালিক এর যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বেথনাল গ্রীন ও বো আসনের এমপি রুশানারা আলী, করডোবা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আনাস আল-তিকরিতি, মুসলিম কাউন্সিল অব বৃটেন এর সেক্রেটারি জেনারেল হারুন রশিদ খান, ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের সাবেক চেয়ারম্যান ও ট্রাস্টি ড. মুহাম্মদ আব্দুল বারী এমবিই, বিবিসি সাংবাদিক আসাদ বেইগ, বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন কিন গাফফার, টিভি প্রেজেন্টার ইমাম আজমাল মাসরুর, বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকের ডাইরেক্টর মার্ক ফার্মানার, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক কনসালটেন্ট হাকান কামুজ, ন্যাশনাল টিচার্স ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট কিরি থাংকস, বিশিষ্ট আইনজীবী কার্ল বাকলে, চ্যারিটি সংস্থা রেস্টলেস বিইং এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাবরুর আহমদ ও সৈয়দ এখলাস।

রুশানারা আলী এমপি বলেন, আমি একাধিকবার রাখাইন রাজ্য পরিদর্শন করেছি। গত ফেব্রুয়ারিতেও রাখাইন গিয়েছি। সেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর কী ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হচ্ছে আমি তা ভালো করেই জানি। তিনি বলেন, আমরা বার্মায় স্থিতিশীল গণতন্ত্র দেখতে চাই, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিক অধিকার দেখতে চাই। তিনি বলেন, মায়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সাং সুচি যখন কারাবন্দী ছিলেন তখন তার মুক্তির জন্য বৃটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ক্যাম্পেইন করেছে। কিন্তু আজ তাঁর দেশে প্রকাশ্য হত্যাযজ্ঞ চলছে আর তিনি নীরব দর্শকের ভুমিকায় রয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা বার্মায় গণহত্যা বন্ধে বৃটিশ পার্লামেন্টে সরকারকে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাবো। মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তিনি বৃটেনের সর্বস্তরের মানুসের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, মায়ানমারে হত্যাকান্ড বন্ধে প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকার এমপির কাছে চিঠি লিখুন। তাহলে সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টে কথা বলবেন। এ ব্যাপারে তাঁর সোচ্চার ভুমিকা অব্যাহত থাকবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বার্মা সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য বৃটিশ সরকার প্রতি বছর মোটা অংকের অর্থসহায়তা দিয়ে থাকে। আমরা এই আর্থিক সহযোগিতা অবিলম্বে বন্ধ করতে সরকারের প্রতি জোর দাবী জানাচ্ছি।

হারুন রশিদ খান অং সাং সুচির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তিনি দীর্ঘ দিন কারাবন্দী ছিলেন। তার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ আন্দোলন করেছে। ফলে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু এখন যা করছেন তা হিপোক্রেসি ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন, লন্ডন ব্রিজ অ্যাটাকের পর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছিলেন এনাফ ইজ এনাফ। আমিও আজ এই সমাবেশে বলতে চাই এনাফ ইজ এনাফ। অনেক হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্যাতন বন্ধ করুন।

ড. মুহাম্মদ আব্দুল বারী এমবিই বলেন, বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন চলছে। দুই দশক আগে আমাদের চোখের সম্মুখে বসনিয়া ও রোয়ান্ডায় এ ধরনের হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধে আন্তর্জাতিক কমিউনিটিতে অনতিবিলম্বে সোচ্চার হতে হবে। তিনি বলেন আমরা জানি সবকিছুর পেছেনে বিশ্ব রাজনীতি আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজনীতি একপাশে রেখে আমাদের মানবতার পাশে দাড়ানো জরুরী।

বিবিসি সাংবাদিক আসাদ বেইগ বলেন, বার্মার বৌদ্ধরা যেখানে একটি মশাকে হত্যা করা অপরাধ মনে করে, সেখানে তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মশার চেয়েও মানুষের মুল্য তাদের কাছে অনেক কম। তিনি বলেন, টেলিফোন সাক্ষাতকারে এক রোহিঙ্গা মুসলিম তরুণী তার কাছে ধর্ষণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ৬ বার্মিজ সেনা কীভাবে তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছিলো তার লোমহর্ষক বর্ণনা শুনলে গা শিউরে ওঠে।

বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন কিন গাফফার বলেন, আমরা একেবারেই অসহায়। আপনারা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভরসা নেই। আপনারাই আমাদের আশার আলো। আপনারা ভয়েস রেইজ করুন। নিজ এলাকার এমপির কাছে লিখুন। আপনারা লিখলে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি জাগবে। এই মুহুর্তে বার্মায় হত্যা বন্ধ না করলে রাখাইন রাজ্যে আর কোনো মুসলিম রোহিঙ্গা থাকবে না। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। ৩০ হাজার রোহিঙ্গা পর্বতের চুড়ায় অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতন দিনযাপন করছে। ৪/৫ বছরের শিশুর সম্মুখে তার মা বাবাকে নারকীয় কায়দায় হত্যা করা হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলিমগণ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।

টিভি প্রেজেন্টার আজমাল মাসরুর বলেন, বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা নতুন কিছু নয়। তিনি ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে দেখে আসছেন। কীভাবে নিরপরাধ নারী, পুরুষ, শিশু কিশোরদের জীবন্ত গণকবর দেয়া হচ্ছে। কীভাবে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীদের উলঙ্গ করে গাছের সাথে হাত-পা বেধে নির্যাতন করা হচ্ছে। ধর্ষণ করা হচ্ছে পালাক্রমে। গর্ভবতী নারিকে লথি মেরে বাচ্চা প্রসব করিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তিনি বলেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলিম, অমুসলিম, নাস্তিক, আস্তিক সকল ধর্ম-বর্ণের উর্ধে ওঠে আমাদেরকে মানবাধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি বলেন, আজ এখানে আমাদের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া যাবেনা যিনি সকালের নাস্তা খান নি। আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যিনি দুপুরের খাবার খেয়ে আসেন নি এবং এমন কেউ নেই যার ঘরে রাতের খাবার নেই। কিন্তু বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানেরা জীবন বাঁচানোর জন্য একফোটা পানিও পাচ্ছে না।

ড. আনাস আল-তিকরিতি বলেন, আমরা অনেক শোনেছি, অনেক বলেছি। এখন আর বলা ও শোনার সময় নেই। এখন আমাদেরকে এ্যাকশনে যেতে হবে।   আইনজীবী হাকান কামুজ বলেন, মুসলিম দেশে দেশে হত্যাযজ্ঞের মূল কারণ মুসলমানদের মধ্যকার অনৈক্য। তাই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বসনিয়ায় গণহত্যা হয়েছে। এখন বার্মায় হচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো দেশে হতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই।

মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারিস্টার কার্ল বাকলে বলেন, বসনিয়া, রোয়ান্ডা ও কম্পোডিয়ায় গণহত্যার বিচার হয়েছে। বার্মার গণহত্যারও বিচার হবে। এ জন্য প্রয়োজন হত্যাকান্ডের যাবতীয় প্রমাণাদী সংরক্ষণ করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা।

উল্লেখ্য, সমাবেশের শেষ দিকে বার্মার নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য ফান্ডরেইজ করা হয়। বিশিষ্ট টিভি প্রেজেন্টার আজমাল মাসরুর ফান্ডরেইজ সেশন পরিচালনা করেন। মাত্র আধঘন্টায় ১৫৫ হাজার পাউন্ড সংগৃহিত হয়। উপস্থিত অনেকে একাই ১৫ হাজার, ১০ হাজার, ৫ হাজার পাউন্ড করে দান করেন। চ্যারিটি সংস্থা হিউম্যান অ্যাপিল ও রেস্টলস বিইয়ং যৌথভাবে অর্থ সংগ্রহ করে।