৯০ ভাগ স্বর্ণ আসে অবৈধভাবে

47
gb

জিবি নিউজ ২৪

শহর বা গ্রাম সব জায়গাতেই রয়েছে স্বর্ণের চাহিদা। জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী সেখানে চাহিদার তারতম্য রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অলংকার তৈরিতে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া বিয়ে, জন্মদিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিফট হিসেবেও স্বর্ণ দেয়ার প্রচলন রয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশে স্বর্ণের চাহিদা বাড়লেও, তুলনামূলকভাবে বাড়ছে না আমদানি। মোটকথা স্বর্ণ আমদানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। অথচ বাজারে স্বর্ণের ছড়াছড়ি। বাজারে বিদ্যমান এসব স্বর্ণের ৯০ শতাংশই অবৈধ পথে আসে বলে জানা গেছে।                    
বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে প্রায় প্রতিদিনই স্বর্ণসহ যাত্রীদের আটকের ঘটনা ঘটছে। তবে এসব যাত্রী অর্থের বিনিময়ে শুধু স্বর্ণ বহনের কাজ করে থাকেন। এমনকি যাত্রীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এয়ারলাইনসের কর্মীরাও।

সম্প্রতি সাড়ে ৯ কেজি স্বর্ণসহ এক কেবিন ক্রু আটক হন যিনি ইউএস-বাংলায় কর্মরত ছিলেন। অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালানের কথা স্বীকারও করেছেন তিনি।

এ ছাড়া শাহজালাল বিমানবন্দরে সর্বশেষ দুই কেজি ১৩৬ গ্রাম ওজনের কোটি টাকার স্বর্ণসহ সাত যাত্রীকে আটক করা হয়েছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সূত্রমতে, ২০১০ সালের জুন থেকে এখন পর্যন্ত এ বিমানবন্দরে প্রায় ৬০০ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পরিবহনকারীদের আটক করা গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এর পেছনের মূল হোতারা।

জানা গেছে, দেশে যে পরিমাণ স্বর্ণের প্রয়োজন হয় তার ৯০ শতাংশই পূরণ হয় অবৈধভাবে আসা স্বর্ণ দিয়ে। সূত্র জানায়, দেশে বছরে ২০-৪০ টন স্বর্ণ লাগে। দেশে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৮ হাজারের মতো। অবশ্য বৈধ ব্যবসায়ী মাত্র ৩২ হাজার। ঢাকা শহরে স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে লাইসেন্স আছে মাত্র ৮০৩ প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১১ মার্চ স্বর্ণ আমদানির ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করে, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি মাসেই। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র চারজন ব্যবসায়ী স্বর্ণ আমদানি করতে আবেদন করেছেন।

ডিলার লাইসেন্সের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম মেনে যেসব প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা হবে, তারাই লাইসেন্স পেতে পারে। স্বর্ণ আমদানিতে প্রতিপদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। তাই যেকোনো সময় লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ আছে। কিন্তু চার মাসে মাত্র চারজন ব্যবসায়ী আবেদন করেছেন। এতেই বোঝা যায়, স্বর্ণ আমদানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ নেই। তারা চোরাইপথে আসা স্বর্ণ কিনতেই অধিক আগ্রহী।

এদিকে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ আসছে। এর মধ্যে সামান্য কিছু স্বর্ণই দায়িত্বরত বিভিন্ন সংস্থার হাতে ধরা পড়ে। চোরাইপথে আসার পর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ধরা পড়ে স্বর্ণের বার ও স্বর্ণালংকার। নিয়মানুযায়ী তা জমা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে বর্তমানে জমা রয়েছে প্রায় দুই হাজার ৯৭৭ কেজি স্বর্ণ। এর মধ্যে মামলা প্রক্রিয়ায় আলামত হিসেবে স্বর্ণের বার ও স্বর্ণালংকার মিলিয়ে জব্দ রয়েছে প্রায় দুই হাজার ৯৩০ কেজি। চোরাই হিসেবে আটক স্বর্ণ নিলামে বিক্রির বিধান থাকলেও মামলার আলামত হিসেবে আইনি বেড়াজালে আটকা থাকে বিপুল স্বর্ণ। ১১ বছর পর নিলামের মাধ্যমে স্বর্ণ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, যেসব স্বর্ণের বিপরীতে করা মামলার নিষ্পত্তি হয় এবং ভল্টে রাখা স্বর্ণ যদি আদালতের মাধ্যমে সরকারের অনুকূলে জব্দ করা হয়, সেসব স্বর্ণ নিলাম করা হয়। তবে যেসব স্বর্ণের বার ‘বিস্কুট’ আকারে আছে, সেগুলোকে বিশুদ্ধ স্বর্ণ মনে করা হয়। এগুলো সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে নেয়। পরে তারা এগুলো রিজার্ভে দেখানোর জন্য ভল্টে রেখে দেয়। নিলামের টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে দিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে বিভিন্ন সময় চোরাইপথে আসা জব্দকৃত স্বর্ণের বার জমা রয়েছে দুই হাজার ১৩১ কেজি ৫৫৪ গ্রাম ৫৪০ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে আটক স্বর্ণালংকারের মজুতের পরিমাণ ৮৪৫ কেজি ৮২৬ গ্রাম ৬৬৩ মিলিগ্রাম। এসব স্বর্ণের মধ্যে মামলা প্রক্রিয়াধীন স্বর্ণের বারের পরিমাণ দুই হাজার ১১১ কেজি ৮০ গ্রাম ৮৪০ মিলিগ্রাম এবং স্বর্ণালংকার ৮১৯ কেজি ২৮১ গ্রাম ১৯৩ মিলিগ্রাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ পাচারের অর্ধশতাধিক মামলা প্রায় ধামাচাপা পড়ে আছে। অধিকাংশ মামলারই অগ্রগতি শূন্যের কোটায়। কোনো কোনো মামলা ঝুলে আছে বছরের পর বছর। তদন্তের নামে বিভিন্ন সংস্থার হাতবদল হলেও শেষ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ায় যেতেই সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। উল্টো বরাবরের মতো আড়ালেই থাকছে চোরাচালানি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। অন্যদিকে জড়িতরা শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় স্বর্ণ চোরাচালানের প্রবণতাও বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, চোরাইপথে আসা স্বর্ণসংক্রান্ত বেশির ভাগ মামলা বিচারাধীন। আর বিচারাধীন থাকায় ওসব স্বর্ণালংকার নিলাম হচ্ছে না। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বর্ণের বার বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামে দেয় না। প্রয়োজন মনে করলে এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে নিয়ে রিজার্ভে যুক্ত করে। এদিকে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ঢাকা কাস্টম

হাউস সংস্থা দুটির কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় বিমানবন্দর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বহু স্বর্ণ জব্দ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বিভিন্ন দেশ ঘুরে এসব স্বর্ণ এ দেশে আনলেও মূলত তা সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছে পাশের দেশগুলোতে।

তবে গোয়েন্দা ও কাস্টমস সূত্র বলছে, এখন অবৈধ পথে দেশে স্বর্ণ আসা অনেকটাই কমে গেছে। মাঝেমধ্যে চোরাইপথে কিছু স্বর্ণ এলেও সেগুলো গোয়েন্দাজালে ধরা পড়ছে। কিছু আবার গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত পথে স্বর্ণ চোরাচালানি থেমে নেই। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বর্ণের ব্যাপক চাহিদা ও শুল্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির নীতিমালা কার্যকর না হওয়ায় উদ্বেগজনক হারে স্বর্ণ চোরাচালান চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এসব পথে অবাধে চলছে স্বর্ণ চোরাচালানের মতো ঘটনা। আশঙ্কার কথা হলো, সীমান্তে অস্ত্র ও মাদকের বিনিময় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এসব স্বর্ণ।

জানা গেছে, থানায় কারও বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা হলে পুলিশ তদন্তে নামে। তদন্তে কারও দোষ পাওয়া গেলে সেই ব্যক্তির বিচারের জন্য আদালতে দেয়া প্রতিবেদনটি হচ্ছে অভিযোগপত্র। আর তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়া গেলে, প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলে কিংবা অপরাধের সঙ্গে আসামিদের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর মামলা খারিজ হয়ে যায়। আর স্বর্ণ আটকের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় মামলা এবং আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা হয় না।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কিছু রাজনীতিবিদ স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে মূল হোতারা চিহ্নিত হলেও তারা আড়ালেই থাকছে।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More