জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশকে ‘অলৌকিক’ জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন

42

জিবি নিউজ 24 ডেস্ক//

জলবায়ু পরিবর্তনকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে এর প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বসম্প্রদায়কে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশকে ‘অলৌকিক’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, জলবায়ু অভিযোজনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এ দেশ। আর বিশ্বব্যাংকের সিইও ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সামনের দিকে বাংলাদেশ। এ দেশের সাফল্যে তিনি মুগ্ধ বলেও উল্লেখ করেন।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ঢাকা মিটিং অব দ্য গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁরা এসব কথা বলেন।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন শেখ হাসিনা। এতে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা সি হেইন, গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এবং সম্মেলনের কো-চেয়ার ও বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিভা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সামনের সারিতে থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে বান কি মুন এবং ক্রিস্টিলিনা জর্জিভা শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা অবগত আছেন, আমরা কক্সবাজার জেলায় মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। কক্সবাজারের যেসব এলাকায় রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাদের উপস্থিতি এসব এলাকাকে আরো অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এসব বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে দেখভাল করার পাশাপাশি অতি দ্রুততার সঙ্গে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আমি বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কিভাবে কাজ করা যায় সে দিকনির্দেশনাও দেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সবাই সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে জন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।’

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সবাইকে সজাগ থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘গ্লোবাল কমিশন অব অ্যাডাপটেশনের সহযোগিতায় আমরা জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় সঠিক অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী পন্থা ও ঝুঁকি নিরসন ব্যবস্থার সুবিধা পেতে চাই। আগামী সেপ্টেম্বরে ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটে প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর জন্য আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি। ওই সভায় এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অভিযোজন প্রক্রিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখানে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি রাখে। আমি বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি।’

জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ওপরে পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। তিনি বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এডিবির জলবায়ু এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ‘আমাদের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ কমে যাবে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ৬০ লাখ জলবায়ু অভিবাসী রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, ঘন ঘন বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রতল বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বিস্তৃত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো কৃষি, শস্য, পশু ও মৎস্য সম্পদের বিপুল ক্ষতি করছে এবং বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

মন্তব্য
Loading...