খুলনা থেকে শান্তিনিকেতন (শেষ পর্ব )

77
পূর্ব প্রকাশের পর। …
শেখ মহিতুর রহমান বাবলু ||
সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ শান্তিনিকেতন নামে আজও  বিদ্যালয়ের ক্লাস বসে মুক্ত হাওয়ায়।  একশ বছরের পুরনো বট গাছের পাদদেশে।  পাখীয় গান শুনতে শুনতে আর রঙ বেরঙের ফুলের সুগন্ধে মাতোয়ারা হয় মন ।তার মাঝে আবার পাতা ঝরার গান আর মন কেমন করা বাউলি বাতাস— এখানে ২৫ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি জায়গা জুড়ে আছে অসংখ্য শিশু শিক্ষালয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেন্দ্র, হস্তকলাশিক্ষাকেন্দ্র ও বিশ্বভারতী নামে এক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় যাতে চৌদ্দটিরও বেশি শিক্ষাবিভাগ আছে। এই চৌদ্দটি বিভাগের মধ্যে চারুকলা, সংগীত, নৃত্য ও নাট্য বিভাগ সব থেকে প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত।
সবশেষে বাড়ির উত্তর দিকে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত হাম্বার গাড়িটি দেখতে গেলাম । এর পাশেই আছে জ্যামিতিক গোলাপ বাগান, রবীন্দ্রনাথের হাতে লাগানো নিম ,পেয়ারা, আম, লেবু, লিচুসহ নানা প্রজাতির গাছ।
রবীঠাকুরের  নিজ হাতে লাগানো  নিম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হল নুহাশ পল্লীর  কথা।এই  নামটা পরিচিত আমাদের সবার  কাছেই। ঢাকার অদুরে গাজীপুরে অবস্থিত একটি বিশাল বাগানবাড়ী। কিংবদন্তী কথাসাহিত্যক হুমায়ুন আহমেদ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নুহাশ পল্লী প্রতিষ্ঠা করেন। লেখক  সুযোগ পেলেই  এই পল্লীতে চলে আসতেন সময় কাটাতে।তিনি যখনই যে দেশে  ভ্রমন করতেন সেখান থেকে  বিভিন্ন রকমের গাছ সংগ্রহ করতেন।নুহাশ পল্লীতে খেজুর, চা ও সাধারণ গাছ সহ  প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলের এবং ঔষধি দুর্লভ গাছ রয়েছে।প্রতিটি গাছের গায়ে সেটে দেয়া আছে পরিচিতি ফলক, যা দেখে গাছ চেনা যায়  সহজেই।
বিশাল এলাকা জুড়ে সবুজ মাঠের মাঝখানে একটি বড় গাছের উপর ছোট ছোট ঘর।  বাগানের এক পাশে “বৃষ্টি বিলাস” নামে  বাংলো-বাড়ি ।নুহাশ পল্লীর আরেক আকর্ষণ “লীলাবতী দীঘি”। দীঘির চারপাশ জুড়ে নানা রকমের গাছ। রয়েছে সান বাধানো পুকুর ঘাট।  পুকুরের মাঝখানে একটি দ্বীপ। সেখানে অনেকগুলো নারকেল গাছ।ছবির মতো সাজানো গোছানো এই বিশাল উদ্যানে ঢুকে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই হাতের বাঁ-পাশে শেফালি গাছের ছায়ায় নামাজের ঘর। এর পাশেই তিনটি পুরনো লিচুগাছ নিয়ে একটি ছোট্ট বাগান। লিচু বাগানের উত্তর পাশে জাম বাগান আর দক্ষিণে আম বাগান। ওই লিচুবাগের ছায়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন সবার প্রিয়  হুমায়ূন আহমেদ।
দেশের যুব সমাজ ,হুমায়ুন প্রেমী সর্বোপরি সরকার উদ্যোগী হলে নুহাশ পল্লীকে বাংলাদেশের শান্তি নিকেতনে রূপ দেয়া সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন  উদ্যোগ গ্রহণ ও গবেষণা।সেটা দেশে থেকে শুরু করতে হবে । আবার দেশের বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে – তাহলে আন্তর্জাতিক মানের কবি ,সাহিত্যিক,সাংবাদিক ও গবেষক  আসবেন। তাঁরাও বিষয়টা জানবেন৷
তবে  গবেষণার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ৷ যা বাংলাদেশে নেই। এর মানে হলো গবেষণার গুরুত্বটা সরকারি পর্যায়ে বুঝতে হবে।  চিন্তা করতে হবে দীর্ঘমেয়াদে এবং এই খাতে বিনিয়োগ করতে হবে দেশের স্বার্থে ৷ তার সাথে সাথে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়  ও ভালো গবেষকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।  যাতে করে গবেষণায় তাঁরা উদ্বুদ্ধ হন৷ শিক্ষকদের বেতন কাঠামো, পিএইচডি গবেষকদের ভাতা বাড়ানোসহ নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য উদ্যোগ নিতে  হবে ৷ প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশে বিদেশে তাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রোগ্রাম করতে হবে। তাহলে বাংলা সাহিত্যের উজ্জল নক্ষত্র জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক, নাট্যকার, উপন্যাসিক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের কে যথার্থ মূল্যায়ন করা হবে।এক দিন তার জন্য মিলবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ।উজ্জল  হবে দেশ ও  জাতির মুখ।
এবার হয়ে এলো সন্ধ্যা। রাতের শান্তিনিকেতনর  আবার সম্পূর্ণ অন্যরুপ। সেই রুপের বর্ণনা আজ আর নয় ।এমনিতেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেল। সময় সুযোগ মতো লিখবো আর একদিন।
বইপুস্তকে   শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন উৎসবের কথা পড়েছি – রবীন্দ্রজয়ন্তী, বসন্ত উৎসব ,বর্ষামঙ্গল,শরৎ উৎসব ,নন্দনমেলা , পৌষমেলা, মাঘমেলা ইত্যাদি।বসন্তের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের ভাব সেই আদিকাল থেকেই। শিমুল, পলাশ, ফাগুন আর সুন্দরী প্রেমিকার  হাত ধরে এখানে নেমে আসে বসন্ত। দোল পূর্ণিমার দিনে হয় বসন্ত উৎসব । এদিন নানা রঙের আবিরে ছেয়ে যায় শান্তিনিকেতনের আকাশ-বাতাস। আমরা যে সময়টাতে গিয়েছিলাম, সেই সময়ে অবশ্য কোনো উৎসবের দেখা পাই নি। শিমা সেন  আবার কখনো এই উৎসবগুলি দেখার জন্যই  শান্তি নিকেতন  আসতে  নেমতন্ন করলেন আমাকে ।
সযত্নে লালিত চুল তাঁর – তেল দিয়ে পরিচ্ছন্ন করে বাঁধা বেণি। বয়সের রেখার কাটাকুটি সারা মুখ জুড়ে। পায়ে হাওয়াই চপ্পল আর পরনের সাদা শাড়ি গোড়ালির একটু ওপরে উঠে আছে। সারাদিন ব্যাস্ত  সৃষ্টি কর্তার প্রতি  ভক্তি  আর শ্রদ্ধা নিয়ে। ঠাকুরকে উৎসর্গ না করে কিছুই গ্রহণ করেন  না তিনি ।এখন অবশ্য আমাদের সফর সঙ্গী।নাম শিমা সেন।
খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয় তার । নতুন বিয়ের গন্ধ না ফুরাতেই ঘরে আসে নতুন অতিথি। এই নবাগতকে নিয়ে ভালই যাচ্ছিলো দিন। কিন্তু ভাগ্যদেবী বোধকরি এতো সুখ সইতে  পারলেন না। অপ্রাপ্ত বয়সেই সীমার কপালের সিঁদুর গেল মুছে। তার শিবের মত স্বামী  মলয় সেন হটাৎই চলে গেলেন না ফেরার দেশে ।
হিন্দু আইনি জটিলতায় স্বামীর কোন কিছুই পেলেন না শিমা। শিশু সন্তানকে নিয়ে পতিত হলেন মহা সমুদ্রের  ঠিক মাঝখানে  । জীবনের এই চরম ও পরম দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তেও ভেঙে পড়েন নি তিনি । ভাগ্যকে নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করার শপথ নিয়ে নিজের শহর ছেড়ে  চলে যান অন্য এক  শহর। ।হাতের কাজ বিক্রি ও চাকরি করে মানুষের মত মানুষ করে তোলেন  মেয়ে রিপা কে।
একদিন ঠাকুরের পরীক্ষা অবসান  হল। ভাগ্যদেবী  সুপ্রসন্ন হয়ে দরজার কড়া নাড়লেন । শহরের  অতিশয় ভদ্র শিক্ষিত ও কর্মজীবী সুদর্শন এক যুবক।কোন দেনা  পাওনার হিসাব না কষে ,এক চিমটি সিঁদুর দিয়ে নিজের করে নিলেন সীমার মেয়েকে। গৌত্র পরিবর্তন করে রিপা সেন হয়ে উঠলো  রিপা দাস।
শাশুড়িকে মায়ের আসনে বসালেন জামাই। নিজের কাছেই রাখলেন তাকে। শিমা সেনের জীবনে আবারো নতুন করে বইতে শুরু হল  সুখের বাতাস। কিন্তু পৃথিবীর সব সুখকে উপেক্ষা করে তিনি নিজের জন্য স্থান করে নিলেন মন্দিরে।হিন্দু ধর্মের উচু দিক্ষায় দীক্ষা নিলেন তিনি। পৃথিবীর জাগতিক সম্পদকে উপেক্ষা করে  ঠাকুরের উপাসনা, মন্দির দেখা শুনা  আর মানুষের সেবা করাই এখন তার এক মাত্র কাজ । এই কাজে তিনি ছুটে  বেড়ান এ মন্দির থেকে ঐ  মন্দিরে। এ দেশ থেকে ওদেশে।
আমরা ফিরতি ট্রেনে চেপে বসেছি। বন্দনা মামী রাতে আমাকে তাদের বাসায় খেতে বললেন।কলকাতার মানুষের মেহমানদারী সম্পর্কে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি। কি করবো ভাবছি।  সারাদিন প্রশান্ত মামা ও তপন দাদা আমাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন মোবাইল ফোনে । জীবিকার তাগিদে তারা আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী হতে পারেন নি।
 ইতিমধ্যে বন্দনা মামীর ছেলে মেয়ের সাথে আমার বেশ ভাব হয়েছে।মেয়ে রিয়া ঠাস ঠাস করে কথা বলে । সর্বক্ষণ আমার আসে পশে থাকতে পছন্দ  তার।আমি তাকে বলি আপুমনি আর সে  আমাকে ডাকে আংকেল বলে । কি এক মজার ব্যাপার। রিয়া’র  ইচ্ছা সে  আমার সাথে লন্ডন যাবেই ।
সবার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। ট্রেনের ঝাকুনিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে । রাতের অন্ধকার কেটে কেটে আমরা  ছুটে  চলেছি । দূর থেকে কানে ভেসে আসছে ঝি ঝি পোকার ডাক ।ট্রেনের ছিটে হেলান দিয়ে ভাবছি ।রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল রচনা আমাদের চলমান জীবনে এক অমিত শক্তি হিসেবে কাজ করবে অনন্তকাল । (সমাপ্ত )
লেখক : টিভি উপস্থাপক ,কলামিস্ট লেখক
মন্তব্য
Loading...