অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ||
বাংলাদেশে প্রতিবছর এক কোটি থেকে এক কোটি ২০ লক্ষ গবাদিপশু কোরবানি করা হয়, এর অর্ধেক গরু ও মহিষ । কোরবানির সময় সংরক্ষণ ও অসচেতনতার কারণে মোট সংগৃহীত চামড়ার প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ (পরিসংখ্যান ভেদে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) কাঁচা চামড়া প্রাথমিক পর্যায়েই নষ্ট হয় । নষ্ট হওয়া চামড়ার সংখ্যা প্রায় চার থেকে পাঁচ লক্ষ পিস । যার আর্থিক মূল্য ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা । লবণের ঘাটতি, লবণ প্রয়োগের বিলম্ব, অদক্ষ কসাই, তীব্র গরম, পরিবহন জটিলতা, এবং ন্যায্য মূল্য না পেয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়া চামড়া নষ্ট হওয়ার মূল কারণ । দীর্ঘদিন যাবতই চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে । কিছুক্ষণ আগে টেলিভিশনের খবরে দেখলাম আজকে ঈদের দিনে (২৮/৫/'২৬) রাজশাহীতে গরুর চামড়া প্রতিটি ১০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ১০ টাকা থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । সরকার নির্ধারিত প্রতি বর্গফুট ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় কোথাও চামড়া বিক্রি হচ্ছে না । আশঙ্কা করছি সন্ধ্যা লাগাদ খবর আসবে প্রচুর চামড়া ময়লার স্তূপে বা ড্রেনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে । বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই ঘটনাটি বেশি ঘটবে । কৃত্রিম ও ভেগান লেদারের উত্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাঁচা চামড়া চাহিদা আশংকাজনক ভাবে কমে যাচ্ছে । কিছু বিলাসবহুল চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, যেগুলো আমরা তৈরি করতে পারিনা । এলডাব্লিউজি (LWG) সার্টিফিকেশনের অভাবে ইউরোপ-আমেরিকা আমাদের চামড়া নিচ্ছেনা । যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজার দামের চেয়েও ৪০% কম দামে কেবলমাত্র চীনে আমাদের চামড়া রপ্তানি করতে হয় । চামড়াজাত পণ্যেরঞ এত বেশি ধরনের বিকল্প এখন বাজারে চলে এসেছে যে চামড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে চামড়ার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নিজেরাই শঙ্কিত । এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই চামড়া নিয়ে আমরা কি করব । চামড়া কি আমরা খেয়ে ফেলবো ?
গরুর চামড়া খাওয়ার সবচেয়ে বেশি প্রচলন রয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে বিশেষ করে নাইজেরিয়া ও ঘানায়, তাছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, জ্যামাইকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশে এটি জনপ্রিয় খাবার । বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী ও বরিশালে অঞ্চলে কোরবানির পর গরুর মাথার চামড়া রান্না করে খাওয়ার একটি আঞ্চলিক ঐতিহ্য রয়েছে । নাইজেরিয়ায় এই খাবারকে 'পনমো' (Ponmo), এবং ঘানায় 'ওয়েলে' (welle) বলা হয় । এ সকল খাবার তৈরি করতে প্রথমে চামড়ার লোম পুড়িয়ে, সিদ্ধ করে অথবা বেঁছে পরিষ্কার করা হয় । টুকরো করা চামড়া দীর্ঘক্ষণ সেদ্ধ করে নরম করা হয় । তারপর মাংসের মতই বিভিন্ন পদ যেমন সুপ, ঝাল স্টু, মসলা দিয়ে করা ভাজা করে খাওয়া হয় । ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় এ খাবার কিকিল (kikil) বা krecek নামে পরিচিত । ইন্দোনেশিয়ায় গরুর চামড়া ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে ক্র্যাকার্স বা মুচমুচে পাপড়ের মতো করে তৈরি করে ভাতের সাথে খাওয়া হয় । এছাড়া চামড়া সেদ্ধ করে নারকেলের দুধ, লঙ্কা ও গরম মসলা দিয়ে 'সাম্বাল গোরেং কিকিল' নামক একপ্রকার ঝাল কারি বা 'গ্রেভি' তৈরি করে খাওয়া হয় । গরুর চামড়ায় প্রচুর পরিমাণে 'কোলজেন' এবং 'লিজাটিন' থাকে যা মানুষের ত্বক, হাড় ও জয়েন্টের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো । এতে চর্বির পরিমাণ মাংসের তুলনায় বেশ কম । যারা চর্বিবিহীন মাংস খেতে চান তাদের জন্য গরুর চামড়া একটি সহনীয় বিকল্প হতে পারে ।
ইসলাম ধর্মে গরুর চামড়া সম্পূর্ণ জায়েজ বা হালাল । ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী যে পশু খাওয়া হালাল সেই পশুর চামড়া খাওয়া বৈধ । সংক্ষেপে শরীয়তসম্মতভাবে জবেহ করা পশুর চামড়া যদি ভালোভাবে পরিষ্কার করে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করা হয় তবে তা খাওয়ার কোন ধর্মীয় বাধা-নিষেধ নেই । আল্লাহতালা সূরা আন-আমের ১৪৫ নম্বর আয়াতে জবাইকৃত হালাল প্রাণীর কেবলমাত্র প্রবাহিত রক্ত ব্যতীত বাকি অংশগুলো হালাল ও পবিত্র ঘোষণা করেছেন । যেহেতু পশুর চামড়া প্রবাহিত রক্ত নয় তাই এটি খাওয়া বা ব্যবহার করা হালাল । হানাফী পিকহের বিখ্যাত কিতাব "বাদায়েউস সানায়ে" ইসলামী শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী পশুর ৭টি অংশ খাওয়া নিষিদ্ধ বা মাকরুহ (যেমন প্রবাহিত রক্ত, পিত্ত, মূত্রথলী, লিঙ্গ ইত্যাদি )। এই নিষিদ্ধ সাতটি অংশের তালিকায় চামড়া অন্তর্ভুক্ত নয় । সুতরাং জবাই করা হালাল পশুর চামড়া খাওয়া এবং ব্যবহার করা শতভাগ জায়েজ ।
চামড়া থেকে পশম ছাড়ানোর পর ছোট ছোট টুকরা করে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে । গন্ধ দূর করার জন্য সামান্য লবণ ও হলুদ দিয়ে ১০ মিনিট সেদ্ধ করে পানি ফেলে দিলে চামড়ার চ্যাপচ্যাপা ভাব এবং অবশিষ্ট গন্ধ পুরোপুরি চলে যাবে । চামড়া পুরোপুরি সিদ্ধ হতে একটু বেশি সময় লাগে বিদায় প্রেসার কুকারে রান্না করলে সময় বাঁচবে । ভাত, রুটি বা পরোটা দিয়ে খেতে অসাধারণ লাগে বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া প্রবাসী আমার এক চিকিৎসক বন্ধু ।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন