নজরুল ইসলাম //
রাজনীতি এবং অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হলেও, যখন রাজনীতি অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে, তখন দেশ সত্যিই খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর বৈশ্বিক ও দেশীয় অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি জঞ্জালে আবর্তিত।
নীতি নির্ধারণে অদূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে স্বল্পমেয়াদী 'রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন,ভর্তুকি বজায় রাখা যা বাজেটে ঘাটতি বাড়ায়। প্রয়োজনীয় সংস্কার (যেমন কর ব্যবস্থা বা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার) রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়ে পিছিয়ে দেওয়া।
প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও দুর্নীতি, রাজনীতি যখন অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন বা বিচার ব্যবস্থার মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থনীতিতে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম হল রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সুবিধা পায়, যার ফলে সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়। ব্যাংকিং খাতে প্রভাব, রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ব্যাংকিং খাতকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
মূলধনী পাচার ও আস্থার সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়।
অবৈধ পথে (হুন্ডি বা মানি লন্ডারিং) দেশ থেকে বিশাল অংকের অর্থ বাইরে চলে যায়, যা অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দেয়। বিগত দিনগুলিতে বাংলাদেশে দায়িত্বশীলরা এর লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। আর প্রক্রিয়া অব্যাহত, রয়েই গেছে।
মেগা প্রকল্প ও ঋণের বোঝা, কখনও কখনও রাজনৈতিক গৌরব প্রচারের জন্য অর্থনৈতিক উপযোগিতা যাচাই না করেই বিশাল সব 'মেগা প্রকল্প' হাতে নেওয়া হয়। এর ফলে বৈদেশিক ঋণের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হয়।
বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান রাজনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই করতে এবং 'খাদের কিনারা' থেকে রক্ষা করতে দরকার রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও সুশাসন, দক্ষ মানবসম্পদ ও কারিগরি শিক্ষা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রবাসী আয় (Remittance) বৈধ পথে আনা এমন চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে কাজ করতে হবে।
অর্থনীতি যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যায়। একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অপরিহার্য।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন