কেরানি আবজালের শতকোটি টাকার সম্পদের খোঁজ

অবশেষে সাময়িক বরখাস্ত

রাজধানীতে রয়েছে একাধিক বহুতল ভবন, আছে ফ্ল্যাট ও প্লট। অস্ট্রেলিয়া এবং সিঙ্গাপুরেও কিনেছেন বাড়ি * স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সম্পদের তথ্য দুদকের হাতে

93
gb

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির রাঘববোয়ালরা কী পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তার একটি খণ্ডচিত্র বেরিয়ে এলো এক কেরানির অবৈধ সম্পদের তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

দেশে-বিদেশে তার সম্পদের পাহাড় সত্যিই অবাক করার মতো। ঢাকায় একাধিক বহুতল আবাসিক ভবন, ফ্ল্যাট, প্লট, বিলাসবহুল একাধিক গাড়ি ছাড়াও বিপুল সম্পদ গড়েছেন বিদেশেও। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরেও কিনেছেন বাড়ি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ধনাঢ্য এই কেরানির নাম আবজাল হোসেন। তিনি চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার অ্যাকাউন্টেন্ট পদে চাকরি করছিলেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে তার এই বিশাল অর্থবিত্তের তথ্য বেরিয়ে আসে। এরই মধ্যে তাকে দু’দফা জিজ্ঞাসাবদও করেছে দুদক।

দুদকের অনুরোধে গত সপ্তাহে সস্ত্রীক তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
এদিকে দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর সোমবার আবজাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী আবজালের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

অবিশ্বাস্য সম্পদ : রাজধানীর উত্তরা মডেল টাউনের ১৩নং সেক্টরের ১১ নম্বর রোডের ৪৭ নম্বর বাড়িটি সবার নজর কাড়ে। তামান্না ভিলা নামের ৮ তলা সুরম্য এই ভবনের মালিক কে, তা নিয়ে নানা কানাঘুষা ছিল প্রতিবেশীদের। কেউ কেউ জানতেন বাড়িটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বড় কর্মকর্তার। কিন্তু কেউ ধারণাও করেননি এত বড় বাড়ির মালিক স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৃতীয় শ্রেণীর এক কর্মচারীর। শেষ পর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধানে সত্য বেরিয়ে আসায় এখন সবাই জেনে গেছেন বাড়ির মালিক স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কেরানির। জানাজানি হওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই বাড়ির সামনে ভিড় করছেন উৎসুক জনতা।

দুদক বলছে, বাড়িটির আসল মালিক আবজাল হোসেন হলেও কাগজে-কলমে এটির মালিকানা দেখানো হয়েছে তার স্ত্রী রুবিনা খানমকে। ভবন ও জমির মূল্য মিলিয়ে এই সম্পদের দাম এখন অন্তত ১৫ কোটি টাকা। তবে শুধু এই ভবনই নয়। উত্তরা এলাকায় এমন আরও কয়েকটি ভবনের মালিক আবজাল। বিশেষ করে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে ৬২ ও ৬৬ নম্বর প্লটের বহুতল ভবন দুটিও আবজালের। একই রোডের ৪৯ নম্বর প্লটটির মালিকও স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই কেরানির। এছাড়া একই সেক্টরে ১৬ নম্বর রোডের ১৬ নম্বরের বহুতল বাড়িটিও তারই। এসব বাড়ির মালিকানা যাচাইয়ের জন্য দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে রাজউককে চিঠি দিয়েছে।

জানা গেছে, আবজাল হোসেনের নামে সিটি ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া তার মালিকানাধীন গার্মেন্টের নামে একটি ব্যাংক হিসাব ও আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাখালী শাখায় তার একাধিক ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে।

শনিবার সরেজমিনে ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডের ৪৭ নম্বর বাড়িতে গেলে বাড়ির কেয়ারটেকার মামুন এ প্রতিবেদককে বলেন, বাড়ির মালিকের নাম রুবিনা খানম। তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের ‘কর্মকর্তা’ আবজাল হোসেনের স্ত্রী। এক প্রশ্নের জবাবে মামুন বলেন, আবজাল হোসেনের গার্মেন্টের ব্যবসা রয়েছে। চাকরির পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা করছেন।

দুদক জানায়, ঢাকা ছাড়াও আবজাল তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি কিনেছেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরেও বিপুল অঙ্কের অবৈধ সম্পদ গড়েছেন- এমন তথ্যও আমাদের কাছে এসেছে। এ বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। দুদকের একটি সূত্র জানায়, এরই মধ্যে আবজাল হোসেনের সব ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে কমিশনের মতামত চাওয়া হবে।

ক্ষমতাধর আবজাল : স্বাস্থ্য অধিদফতরে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত আবজাল হোসেন। তিনি স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংগঠনের অন্যতম বড় ‘ডোনার’ (দাতা)। রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে তিনি বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তাও দিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হলেও আবজাল কিছুদিন পরপরই গাড়ির মডেল বদল করেন। কখনও প্রাডো, কখনও পাজেরো স্পোটর্স আবার কখনও বা হ্যারিয়ার গাড়িতে চড়ে অফিসে যান। আবজালের কাছে প্রতিদিনই নানা ধরনের মানুষ সাক্ষাৎ করতে আসেন। এমপি থেকে শুরু করে সাবেক ও বর্তমান অনেক সচিবও আসেন নানা দেনদরবার নিয়ে। এদের অনেককে নিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে হেলিকপ্টারে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও দেশের দুর্গম এলাকায় ভ্রমণেও বের হন। আবজাল হোসেনের একাধিক আত্মীয়স্বজনও স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন পদে চাকরি করেন। তার দুই শ্যালক স্বাস্থ্য অধিদফতরে গাড়িচালক হলেও তারাও প্রভাবশালী হিসেবেই পরিচিত। আরেক শ্যালক চিকিৎসা শিক্ষা শাখায় উচ্চমান সহকারী হিসেবে কর্মরত।

অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফের নামে স্বাস্থ্য অধিদফতরে বিশেষ চাঁদাবাজির কমিটি ছিল। যার নাম ছিল ডা. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কল্যাণ সমিতি। স্বাস্থ্য খাতের তৎকালীন মাফিয়া ডা. জাহিদ ওরফে ড্যাব জাহিদ এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিতেন। সেসময় আবজাল হোসেন ওই কমিটিরও অন্যতম নেতা ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার ভোল পাল্টাতে সময় লাগেনি মোটেই। রাতারাতি তিনি বিএনপি থেকে আওয়ামী ঘরানার নেতা হয়ে উঠেন। আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানম একসময় স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি প্রকল্পে টাইপিস্ট হিসেবে চাকরি করতেন। পরে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে তাকে প্রকল্প থেকে সরকারি চাকরিতে নিয়মিত করা হয়। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র বলছে, সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি সিন্ডিকেটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত আবজাল। চলতি শিক্ষা বছরেও মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি বাণিজ্য হয়েছে, যার পুরোভাগে ছিলেন আবজাল হোসেন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের পুরনো ভবনের দোতলায় চিকিৎসা শিক্ষা বিভাগে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আবজাল হোসেন কয়েকদিন ধরে অফিসে অনুপস্থিত। তার শ্যালক চিকিৎসা শিক্ষা শাখার উচ্চমান সহকারী রেজাউল বলেন, আবজাল হোসেনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। তিনি এখন কোথায় আছেন, তা বলা যাচ্ছে না।

এদিকে আবজাল হোসেনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আরও বেশ কয়েকজন কোটিপতি কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কে দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে দুদক। এদের মধ্যে আছেন ইপিআই বিভাগের কর্মচারী তোফায়েল আহমেদ ও কমিউনিটি ক্লিনিক বিভাগের কর্মচারী আনোয়ার হোসেন। এছাড়া মিঠু ও টোটন নামে দুই প্রভাবশালী ঠিকাদারও আছে দুদকের অনুসন্ধান তালিকায়।

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More