ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: একটি তাওবা- যা একটি জাতিকে বাঁচিয়েছিল

gbn

শায়খ আবদুলবারী ইয়াহইয়া ||

আজ আমি আপনাদের সামনে একটি হৃদয় নাড়া দেওয়া ঘটনা স্মরণ করাতে চাই—নবী মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সময়কার একটি ঘটনা।

সে সময় ভয়াবহ খরা হয়েছিল। পশুপাখি মরছিল, গাছপালা শুকিয়ে গিয়েছিল, শিশুরা ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছিল। বনি ইসরাঈল নবী মূসার কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে বৃষ্টির দোয়া করুন। নবী মূসা সবাইকে খোলা ময়দানে একত্র করলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।

তখন আল্লাহ ওহি পাঠালেন, “হে মূসা! তোমাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি আছে, যে ৪০ বছর ধরে আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত। তাকে বলো, সে যেন এই জমায়েত ছেড়ে যায়, তাহলে আমি বৃষ্টি পাঠাব।”

নবী মূসা জনগণকে বললেন, “যে ব্যক্তি ৪০ বছর ধরে আল্লাহর অবাধ্যতায় আছে, সে যেন এই জমায়েত থেকে বেরিয়ে যায়। সবাই চারদিকে তাকাল, কিন্তু কেউ উঠল না। তবে একজন মানুষ জানত—এই কথা তার জন্যই। লজ্জা, ভয় আর অনুশোচনায় সে মাথা নিচু করল। সে চুপিচুপি, অন্তর থেকে আল্লাহর কাছে তাওবা করল। নিজের গুনাহ স্বীকার করল, চোখের পানি ফেলল, ক্ষমা চাইলো। আর তখনই- আকাশ থেকে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। নবী মূসা বললেন, “হে আল্লাহ! কেউ তো বেরিয়ে যায়নি, তবুও আপনি বৃষ্টি পাঠালেন।”

আল্লাহ বললেন, “হে মূসা! আমি বৃষ্টি পাঠিয়েছি সেই লোকটির তাওবার কারণে। আমি যেমন ৪০ বছর তার গুনাহ ঢেকে রেখেছি, তেমনি তার তাওবার সময়ও আমি তাকে প্রকাশ করিনি।”

এই ঘটনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ফেরেশতার মতো হতে বলেননি। তিনি চান খাঁটি তাওবা, সত্যিকারের অনুশোচনা। একজন মানুষের অন্তরের পরিবর্তন পুরো একটি জাতির ওপর রহমত নামিয়ে আনতে পারে। আজ আমরা অনেক সময় দোষ দিই—নেতাদের, সমাজকে, সময়কে, অন্যদের। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কী বলেন? 'নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।

উম্মাহর পরিবর্তন শুরু হয় আমার ও আপনার হৃদয় থেকে। আল্লাহ আমাদের সম্মান দিয়েছেন। তিনি বলেন: তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো গর্ব নয়—এটা দায়িত্ব। সর্বোত্তম জাতি মানে—সৎ প্রতিবেশী হওয়া, বিশ্বস্ত কর্মচারী হওয়া, নরম ভাষার মানুষ হওয়া, অন্যের কষ্টে পাশে দাঁড়ানো।

আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা:) নবুয়তের আগেই “আল-আমিন” তথা বিশ্বস্ত নামে পরিচিত ছিলেন। খাদিজা (রা:) তাকে বলেছিলেন, “আপনি দুর্বলদের সাহায্য করেন, অতিথিকে সম্মান করেন, বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান।” এই চরিত্র দিয়েই তিনি দুনিয়া বদলে দিয়েছেন।

আমরা প্রশ্ন করি—আমাদের দোয়া কবুল হচ্ছে না কেন? আল্লাহ বলেন “আমি নিকটবর্তী। যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। তিনি বলেননি—নিখুঁত বা পরিশুদ্ধ মানুষের ডাকেই আমি শুধু সাড়া দিই । তিনি বলেছেন—যে আমাকে ডাকে। তাই আজ আমাদের দরকার নিজের দিকে ফিরে আসা, চুপিচুপি তাওবা করা, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা।

নবী (সা:) আমাদের খুব সহজ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন—তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা চায়, তার ভাইয়ের জন্যও তা চায়।” তিনি বলেছেন, একজন মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হলো—যা তার বিষয় নয়, তা ছেড়ে দেওয়া।” তিনি বলেছেন, যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।”

আর যখন একজন ব্যক্তি উপদেশ চাইলো, নবী (সা:) বললেন—“রাগ করো না। কারণ রাগ ঈমান নষ্ট করে, সম্পর্ক ভাঙে, আর আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

তাহলে আসুন, আমরা ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করি। প্রথমত নিজেদের ঠিক করি। আল্লাহর দিকে ফিরে যাই। হয়তো মানুষ দেখবে না, কিন্তু আল্লাহ দেখছেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি তাওবা করার তাওফিক দিন। আমাদের চরিত্র সুন্দর করুন। আমাদের মাধ্যমে উম্মাহর জন্য রহমত নাযিল করুন। আমিন।

শায়খ আবদুলবারী ইয়াহইয়া : অতিথি খতিব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার। শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন