নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিবর্তন কাম্য নয়

237
gb
অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান | উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়  ||
নির্বাচন নিয়ে নানান মহল অনেক অভিযোগ করছেন। এই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি গল্পের কথা মনে পড়ে। গল্পটি হচ্ছে- চল্লিশ হাত চওড়া একটি খাল। খালের একপাশে একজন ব্যক্তি দশ হাত একটি লাঠি হাতে নিয়ে ঘুরাচ্ছেন। খালের অপরপাশ থেকে আরেকজন লোক বলছেন, ‘ওই ভাই আপনার হাতের লাঠি আস্তে ঘুরান।’ তখন লাঠি হাতে লোকটি বললেন, ‘আরে ভাই, আমার লাঠি দশ হাত আর খাল হলো চল্লিশ হাত চওড়া। আপনি খালের ওই পারে। আপনার সমস্যা কী? আপনি এতো অস্তির হচ্ছেন কেন? তখন লোকটি জানাল, ‘একটু আলাপ করলাম ভাই।’ কাজেই নির্বাচন সংক্রান্ত এমন অনেক অভিযোগই আলাপস্বরূপ।  নির্বাচনে পক্ষগুলো আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করে দিয়েছে। এই সব কমিটিগুলোর কাজই হচ্ছে কেবল অভিযোগ করা। অর্থাৎ অভিযোগ কমিটি। আমি কিছুটা আগেও বলেছি, নির্বাচনের প্রচার প্রচারণরার প্রথম দিকে ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া, হামলা, সংঘর্ষের মতো নানা ঘটনা ঘটে। বর্তমানে আমরা একাদশ সংসদ নির্বাচন করছি। অর্থাৎ এর আগে দেশে দশটি নির্বাচন হয়েছে। আমরা যদি বিগত দিনের নির্বাচনী সহিংসতার দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে, এবার নির্বাচনী সহিংসতা তুলনামূলকভাবে একেবারে কম। নির্বাচনের প্রায় ৪০ দিন অতিক্রম হয়েছে। এই কয়েক দিনে একেবারে মিনিমাম পর্যায়ে ভায়োলেন্স হয়েছে। এর পরিসংখ্যান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়েও কম। পোস্টার না লাগাতে দেয়া, প্রচারে বাধা দেয়ার বিষয়গুলো এখন কমে আসছে। শুরুর দিকে খানিকটা উত্তেজনা বিরাজ করে, পরে কমে যায়। বর্তমানে বিজিবি টহল দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সহিংসতা নেই। ছোট-বড় সব দল মাঠে নেমেছে। প্রার্থীরা প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত। সেনাবাহিনীও মাঠে নেমেছে, এতে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে। তারপরও অভিযোগ চলতেই থাকবে। এই সব অভিযোগ- চল্লিশ হাত খাল আর দশ হাত লাঠির মতো। আর এই সবের মধ্যদিয়ে দেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। এর মাধ্যমে আমরা একটি ভালো বিরোধী দল পাবো। এবার নির্বাচনে দল বদলের বিষয়টিও লক্ষ্যণীয়। রেজা কিবরিয়া প্রথমে গণফোরামে যোগদান করেন, পরে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছেন। অনেকে দল ত্যাগ করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়েছেন। কিন্তু জামায়াতের ২২ জন প্রার্থী দল ত্যাগ করেনি। তারা দলের বহাল পদবিতে এখন রয়েছে। তাদের পোস্টারে জামায়াতের পদপদবি লেখা আছে। সারা পৃথিবীতে নির্বাচন হয় মূলত সরকার পরিবর্তনের জন্য। বিপ্লব বা এক্সট্রা জুডিশিয়াল, সামরিক উত্থানের মাধ্যমেও সরকার পরিবর্তন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বিগত দিনে নির্বাচনের মাধ্যমে বা অন্য উপায়ে সরকার পরিবর্তন হয়নি,  পরিবর্তন হয়েছে রাষ্ট্র। এইটি মূল শঙ্কার কারণ। আমাদের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এর মাধ্যমে কেবল সরকার পরিবর্তন হয়েছিল এমন নয়। বদলে যায় রাষ্ট্র। নানা সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যত্থান হয়েছে। একজনকে পরাজিত করে আরেকজন ক্ষমতা দখলে নিয়েছে। এতে ক্ষমতা অর্থাৎ সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের নয়। আমাদের দেশে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট রাষ্ট্র পরিবর্তন করা হয়। বাংলাদেশকে ফের পাকিস্তানী ভাবধারায় নিয়ে যাওয়া হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর রাষ্ট্র নতুন আরেকটি চরিত্র পায়। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করি, কিন্তু তখন রাষ্ট্রের দর্শন ছিল ভিন্নতর। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিত্ব দেয়া হয়। দেশবিরোধীতারা রাষ্ট্রের চরিত্র হরণ করে। প্রবীন রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ সাহেবরা সে সময়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তারা অনেক আশঙ্কায় ছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ভোলা জেলা থেকে প্রায় ২০ হাজার লোককে বের করে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর ওই সমস্ত মানুষ ভোলায় যেতে পারেননি। তাদেরকে পালতে হয়েছে তোফায়েল সাহেবকে। সে সময় যারা ভোলা কলেজে পড়ত, তাদেরকে ঢাকায় থাকতে হয়েছে। এইসব অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। পুরো দক্ষিণ অঞ্চল, সাতক্ষীরা রাগেরহাট থেকে শুরু করে সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক হামলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত দুই হাজার চারশ’ পঞ্চাশটি মামলা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি সনাক্ত করেছে। সত্য যে ঘটনাগুলো ঘটেছে। কিন্তু এই সব সমস্যা হত না, যদি নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল সরকার বদল হত। সরকার বদল হওয়া মানে বিভিন্ন কর্মসূচির বদল হওয়া। সরকারের একেবারে ভালো কর্মসূচি যেমন-  গ্রামের ক্লিনিক ব্যবস্থার মতো এমন অনেক কল্যাণময় বিষয়গুলোও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্র বদলে যায়, রাষ্ট্র চলে যায় পাকিস্তানী ভাবাদর্শে। এটাই আসলে আমাদের মূল সমস্যা। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। তাদের কর্তৃত্ব আরও জোরদার করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে দৃঢ় ভাষায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিতে হবে। কারণ নির্বাচন সুষ্ঠু রাখার দায়িত্ব আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর। সংবিধানের ১২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইসিকে কথা বলার প্রয়োজন। তাহলে ভালো হত। নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয় বরং কর্তব্য। আর কর্তব্য পালন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি বলেন, সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে, তাহলে বিষয়টি দুঃখজনক। এতে প্রমাণ হয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। এই কথা বলাই ঠিক না। নির্বাচনে আমাদের সবই ভালোভাবে সম্পন্ন হলো।  সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে সফল হবে। নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ব্যবহার আমরা বিরোধীতা করি। সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেই সব অভিযোগ শেষ হয়ে যাবে, তা নয়। পোস্টার ছিঁড়ে ফেল, ঢিল মারা, নির্বাচনের অফিসে অগ্নিসংযোগ, এমন অনেক ঘটনা সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও ঘটবে। তখন বলা হবে সেনাবাহিনীও ব্যর্থ। সেনাবাহিনীকে বলা হচ্ছে একটি স্ট্রাকিং ফোর্স। দৈনন্দিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যেসব কাজ করে, সেনাবাহিনী সেসব কাজ করবে না। যেখানে পুলিশ, বিজিবি, অনসার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, সেখানে খবর দিলে সেনাবাহিনী যাবে। এই না করে যদি পোস্টার রক্ষার কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিষয়টি দুঃখজনকই হবে। নির্বাচনের দিন সকাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী। সাংবিধানিক দায়দায়িত্ব নির্বাচনের দিন সকাল পর্যন্ত। নির্বাচন শুরু হলেই দেশের উপর নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। অভিযোগ আসবে, শুনবে, ব্যবস্থা হবে। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্বের উপর। যারা নির্বাচনে প্রতিন্দন্দ্বিতা করছেন, তারা যদি মনে করেন, আমরা ভালোভাবে নির্বাচন করবো, সবাই কেন্দ্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে, তাহলে নির্বাচন ভালো হবে। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা সকাল পর্যন্ত। এরপর পুরো বিষয় নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলের উপর। সেই সাথে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর দায়িত্ব বর্তায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপর আমরা অস্থা রাখতে চাই, এবার একটি ভালো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। যখন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল  হয়, তখনই প্রধানমন্ত্রী উক্ত কথা বলেছিলেন। সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকেও সেইভাবে ভূমিকা পালন করতে হবে।
gb

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More