বইমেলা ও আমাদের অদ্ভুত হিপোক্রেসি!

85
gb

একটা দেশে কিছু মানুষ “বিশুদ্ধ” সাহিত্য চর্চা করবে, এটা যেমন সত্য, তেমনি একটা শ্রেণির কাছে মারজুকের মতো ভ্যাগাবন্ড কবিদের জনপ্রিয়তা থাকবে, আবার অন্য একটা শ্রেণির কাছে সালমানদের স্ক্রিনশট আর করসি-খাইসি ভাষায় লেখা বইও জনপ্রিয়তা পাবে- এটাও সমান সত্য। এর কোনোটাই অস্বাভাবিক না।

সালমান আর মারজুক বিতর্ক দেখতে মজাই লাগছে। আমরা নিজের পছন্দের বাইরে কিছু মানতে পারি না। হুমায়ূন আহমেদের লেখাকেই বিশুদ্ধতাবাদীরা “সাহিত্য” হিসেবে স্বীকৃতি দিত না। বাজারি উপন্যাস বা অপন্যাস বলে আখ্যা দিত। তাই বলে মানুষ কি হুমায়ূনের বই কেনা বন্ধ করেছিল?

একটা দেশে কিছু মানুষ “বিশুদ্ধ” সাহিত্য চর্চা করবে, এটা যেমন সত্য, তেমনি একটা শ্রেণির কাছে মারজুকের মতো ভ্যাগাবন্ড কবিদের জনপ্রিয়তা থাকবে, আবার অন্য একটা শ্রেণির কাছে সালমানদের স্ক্রিনশট আর করসি-খাইসি ভাষায় লেখা বইও জনপ্রিয়তা পাবে- এটাও সমান সত্য। এর কোনোটাই অস্বাভাবিক না।

আবার একইসাথে এগুলোর সমালোচনাও থাকবে, এটাও স্বাভাবিক, ভক্তদেরকে এটাও মেনে নিতে হবে। কিন্তু সেই সমালোচনা যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালাগালি, নিষিদ্ধের দাবি পর্যন্ত গড়ায়, তখন সমস্যা। আর সবচেয়ে হাসি আসে তখন, যখন মারজুকের ভক্তরা তার সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, তার “খাইতে পারতেছিনা”, “লাগাইতে পারতেছি না” নিয়ে আহা-উহু করে, কিন্তু একইসাথে আবার সালমানের বইয়ের সমালোচনা করে। মারজুক যদি তার কবিতায় এই ভাষা ব্যবহার করতে পারে, সালমান কেন তার স্ক্রিনশটের বইয়ে এই ভাষা ব্যবহার করতে পারবে না? বাধাটা কোথায়?

অনেকেই কমন একটা অভিযোগ করছেন- এগুলো কি সাহিত্য? না ভাই, এগুলো সাহিত্য না। কিন্তু আমরা তো জানতাম এটা বইমেলা। “সাহিত্য”মেলা তো কেউ দাবি করছে না। আর সালমান, রাবা খান বা তৌসিফরাও তো নিজেদের বইকে “সাহিত্য” দাবি করছে না! তারা বলছে তারা জাস্ট “বই” লিখেছে। সেই অধিকার তো তাদের আছে!

আমার পছন্দ না হলে আমি না কিনলেই তো হয়ে যায়! বা কেনার পর পড়ে ভালো না লাগলে নেগেটিভ রিভিউ দিলেই তো হয়ে যায়। গালাগালি, নিষিদ্ধ করা উচিত টাইপের মন্তব্যের তো কোনো অর্থ নাই। সরাসরি যদি সহিংসতার পক্ষে, কোনো জাতি/ধর্ম/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য না নাথে, হেটস্পিচ না থাকে, তাহলে কোনো বই, সেটা যত হাস্যকর আর অর্থহীনই হোক না কেন, নিষিদ্ধ করার কোনো মানে নাই।

ভক্তের সাথে মারজুক রাসেল

দুনিয়ার সব দেশেই আলতু-ফালতু বই বের হয়। তাদের কাল্ট ভক্তরা সেগুলো কিনে, কিছুদিন সবাই খুব হই চই করে, এরপর সবাই সেগুলোর কথা ভুলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যাটা হচ্ছে, এখানে এই বইগুলোই বেস্ট সেলার হয়ে যায়। তো এই দোষটা কার? ঐ বইয়ের লেখকদের? না। সেই লেখক এবং তার প্রকাশক উভয়েই জানে, এক শ্রেণির মানুষের কাছে তাদের জনপ্রিয়তা আছে। তারা যা খুশি তা লিখলেও তাদের ভক্তরা সেটা ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য হলেও কিনবে। ব্যবসার এই সুযোগটা তারা ছেড়ে দিবে কেন? যে যতই ভান করুক, আল্টিমেটলি বই একটা পণ্যই।

দোষটা কি তাহলে ঐ পাঠকদের? না। এই ধরনের সেলিব্রেটি লেখকদের ভক্তদের মধ্যে একটা শ্রেণি আছে, যারা জীবনেও বই পড়ে না, সারাদিন ইউটিউব ভিডিও দেখেই তাদের সময় কাটে। ওটাই তাদের জগত। তারা যদি তাদের প্রিয় সেলিব্রেটির এক কপি বই কিনে, তার একটা অটোগ্রাফ নিয়ে, তার সাথে একটা সেলফি তুলে শান্তি পায়, সেটা মোটেও খারাপ কিছু না।

দোষটা তাহলে কার? জ্বী, ঠিক ধরেছেন। দোষটা আমার এবং আপনার। যারা সমালোচনা করছি, নিষিদ্ধের দাবি করছি, তাদের। দেশে কি ভালো বই নাই? প্রতিটা ক্যাটাগরিতেই প্রতি বছর অল্প হলেও ভালো ভালো কিছু বই বের হয়। সেগুলো কেন বেস্ট সেলার হয় না? কারণ আমরা যারা সমালোচনা করছি, দেশ এবং সাহিত্য রসাতলে যাচ্ছে বলে আহাজারি করছি, তাদের একটা বড় অংশই বই কিনি না। বই না কিনেই সমালোচনা করতে আমরা ওস্তাদ।

যত মানুষ মারজুকের, সালমানের সমালোচনা করছে, তাদেরকে গালাগালি করছে, তারা সবাই যদি সিরিয়াস বইগুলো কিনত, তাহলে সেগুলোই বেস্ট সেলার হতো। না, খুব বেশি সিরিয়াস বই আসলে কখনোই বেস্ট সেলার হয় না, কিন্তু অ্যাটলিস্ট একটা-দুইটা ভালো উপন্যাস, ভালো থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন, ইতিহাস, পপুলার সায়েন্স- এগুলো তো বেস্ট সেলার হতো! সেটা যে হচ্ছে না, তার জন্য মারজুকের বা সালমানের ভক্তদেরকে গালাগালি করে লাভ নাই। নিজেদেরকে গালাগালি করাই ভালো।

না, বলছি না সালমান মুক্তাদিরের বা এর আগে রাবা খানের বই কিনুন, সেগুলোর সমালোচনা করবেন না। এদের বই কেনার দরকার নাই। জাস্ট ইগনর করুন। উল্টো দুই একটা ভালো বই নিয়ে আলোচনা করুন। তাহলেই যথেষ্ট। নিষিদ্ধের দাবি তুলে লাভ নাই, হায়-হুতাশ করেও লাভ নাই।

শুধুমাত্র বিশুদ্ধতাবাদী এলিটরা সবকিছু কন্ট্রোল করবে, খেলুম-গেলুম টাইপের সাহিত্য রচনা করবে- সেই দুনিয়া এখন আর নাই। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়া। স্ক্রিনশটের বই বা বাংলিশ বই কেবল স্যাম্পল। প্রচুর নিত্যনতুন আইডিয়ার, উদ্ভট উদ্ভট বই বের হবে- এটা আপনি থামাতে পারবেন না। থামানোর দরকারও নাই। ইগনর করতে পারলেই হবে।

মানুষ ট্যাগ দিতে ওস্তাদ। সো জাস্ট ফর ক্ল্যারিফিকেশন- মারজুকের গানের লিরিক চমৎকার লাগে, বাট গত দুইদিনের স্ক্রিনশনের বাইরে তার কোনো কবিতা কখনো পড়ি নাই, ফেসবুকে তাকে ফলোও করি না। সালমান মুক্তাদিরকেও কখনো ফলো করি নাই, তার কোনো ইউটিউব বা ফেসবুক ভিডিও-ও জীবনে পুরা দেখি নাই। ফ্যান হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এই লেখা মারজুক বা সালমানকে ডিফেন্ড করার জন্য না, এটা জেনারেল ট্রেন্ডের সমালোচনা।

লিখেছে মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা এই আর্টিকেলটি নেয়া হয়েছে এগিয়ে চলো বাংলাদেশ থেকে

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন তবে আপনি চাইলে অপ্ট-আউট করতে পারেন Accept আরও পড়ুন