সহিংস বিক্ষোভে টালমাটাল ফ্রান্স, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল পুলিশ

দাঙ্গা ও লুটপাটের সময় ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বলে স্বীকার করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল বলে জানান।

এ ছাড়া ঘটনার দায় স্বীকার করে তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তাকে পদে বহাল থাকতে বলেছেন।

 

ফ্রান্সের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ নগর অস্থিরতার পর সোমবার ফ্রান্স ইন্টার রেডিওতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, ‘দেশে যা কিছু ঘটছে, তার দায় আমার। তাই আমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।

’

 

শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় প্রায় ১ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমারি সদস্য আহত হন। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০০টির বেশি দোকান লুট করা হয় এবং সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়। নুনেজ স্বীকার করেন, লুটপাট ও ভাঙচুরে জড়িত বিপুলসংখ্যক মানুষকে সামাল দিতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি।

 

তবে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। বরং পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ও সমন্বয় বজায় রাখা এবং লুটপাট মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নুনেজকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে বহাল থাকতে অনুরোধ করেন। রবিবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তথাকথিত ‘অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার’ জন্য উগ্র বামপন্থী ও দুষ্কৃতকারীদের দায়ি করেন।

কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান

সোমবার ফ্রান্স ২ টেলিভিশনকে দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন জানিয়েছেন, বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় আটক কয়েক ডজন ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

ডারমানিন বলেন, ‘২ হাজার ৩৩১ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

তাদের ৭০ শতাংশই প্রাপ্তবয়স্ক এবং তাদের অনেকেই পুলিশের কাছে আগে থেকেই পরিচিত।’ তিনি আরো জানান, আটক ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশের বেশি বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।

 

তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধ দমনে ফ্রান্সের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দক্ষ হলেও উগ্র বামপন্থী বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলায় তারা ততটা কার্যকর নয়।’ ডারমানিন বলেন, ‘স্পষ্টতই, উগ্র বামপন্থীদের কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে আমরা পারছি না। আমরা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হয়েছি।’ এদিকে সহিংসতা ও লুটপাটের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সোমবার জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক করবেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু।

ব্যবসায়ীরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষছেন

ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেটওয়ার্কের প্রধান অ্যালাইন ডি ক্রেসেনজো জানিয়েছেন, দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সহিংসতায় ২ হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে কয়েক কোটি ইউরোর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। রবিবারের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫০০। তবে বিভিন্ন শহর থেকে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির খবর আসায় এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ডি ক্রেসেনজো। প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ ও নান্তেসে রাতভর সহিংসতা অব্যাহত ছিল।

প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানিয়েছেন, রবিবার ও রাতভর শহরটিতে অন্তত আরও ৩০টি দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। তিনি এ পরিস্থিতিকে ‘অসহনীয়’ বলে বর্ণনা করেন। প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলি লর বেকুয়া জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা নিরাপত্তা ক্যামেরা, দোকানের নজরদারি ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখছেন।

ঘটনার ভিডিওচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনার জন্য পুলিশ একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছে। বেকুয়া সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র, রক্তের দাগসহ সম্ভাব্য সব প্রমাণ সংরক্ষণের অনুরোধ জানিয়েছেন।

এদিকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার বাণিজ্যমন্ত্রী সার্জ পাপিনের খুচরা বিক্রেতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ ও হোটেল মালিক, ব্যাংক এবং বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পরে ছাত্র সংগঠনগুলোও যোগ দেয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল তারা। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও বিক্ষোভে অংশ নেয়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিল ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, দেশব্যাপী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল প্রায় ৮ লাখ মানুষ।

বেশিরভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও, পরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা ‘ব্ল্যাক ব্লক’ নামে পরিচিত আন্দোলনকারীদের একটি দল এবং একদল তরুণ দুর্বৃত্ত বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

গত মাসে স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এই অস্থিরতার শুরু হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং এর সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা বিষয় যুক্ত হয়। শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিভিন্ন ভবনে আগুন দেওয়া হয় এবং দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়।

রবিবারও কিছু এলাকায় অস্থিরতা অব্যাহত ছিল। প্যারিসে পুলিশ ৩৫০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় অন্তত পাঁচটি দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী ‘চরম বামপন্থীদের কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারছে না’।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন