শায়খ আনিসুল হক ||
মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না, এটি পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তাই তরুণদের মাদকের ফাঁদ থেকে রক্ষায় পরিবার, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গোটা কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার খুতবায় এসব কথা বলেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম শায়খ আনিসুল হক।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে মাদকের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাদক গ্রহণ, কেনাবেচা এবং এর সঙ্গে জড়িত অপরাধ বহু তরুণের জীবন নষ্ট করছে, পরিবার ভেঙে দিচ্ছে এবং অনেককে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০২৪ সালে মাদকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু নিবন্ধিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে তিন হাজার সাতশর বেশি মৃত্যু মাদকের অপব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, যারা সেই শোক বহন করে।
শায়খ আনিসুল হক বলেন, মাদকের পথে যাত্রা অনেক সময় কৌতূহল, বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা, একাকিত্ব, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মানসিক চাপ থেকে শুরু হয় । কিন্তু কৌতূহল ধীরে ধীরে আসক্তি এবং অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে গ্যাং, শোষণ ও সহিংসতার সম্পর্কও উপেক্ষা করা যায় না। অনেক তরুণকে প্রথমে বন্ধুত্বের নামে খাবার, দামি জুতা বা পোশাক দিয়ে কাছে টানা হয় । পরে ছোট কোনো কাজের অনুরোধ করা হয়—যেমন একটি ব্যাগ নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া। এভাবেই বন্ধুত্ব একসময় বাধ্যবাধকতা ও শোষণে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, এসব তরুণ আমাদের অচেনা কেউ নয় । তারা আমাদের মসজিদে আসে, স্কুল-কলেজে পড়ে, আমাদের রাস্তায় চলাফেরা করে এবং অনেক সময় আমাদের নিজেদের ঘরের সন্তান।
পরিবারের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা বিপদে পড়ার আগেই তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কোনো তরুণ যদি বাবা-মা, শিক্ষক বা ইমামের কাছে গিয়ে বলে, “আমি সমস্যায় আছি”, তাহলে তাকে রাগ বা অপমানের পরিবর্তে সহানুভূতি ও সহায়তা দিতে হবে।
শায়খ আনিসুল হক বলেন, ইসলাম বিপদ ঘটার পর শুধু শোক করতে বলে না, বরং আগেই মানুষকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিজেদেরকে নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।”
তিনি বলেন, মাদক শুধু শরীরের ক্ষতি করে না; এটি মানুষের বিচারবুদ্ধি দুর্বল করে, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে এবং একসময় জীবনের ওপরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। শিশু-কিশোরদের শুধু “মাদক হারাম” বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের বুঝাতে হবে কেন আল্লাহ এটি হারাম করেছেন এবং তাদের জীবন, শরীর, মেধা, পরিবার ও ঈমান আল্লাহর দেওয়া আমানত।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ ভুল পথে চলে গেলে তাকে অপমান করা বা মসজিদ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। পাপকে ঘৃণা করতে হবে, কিন্তু মানুষকে নয়।
আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সূরা জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াত উদৃত করেন: “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
মাদক ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে শায়খ আনিসুল হক বলেন, “আল্লাহকে ভয় করুন। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ তথাকথিত হালাল ব্যবসার মাধ্যমে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করলেও আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই গোপন নয়।”
তিনি বলেন, দামি গাড়ি, পোশাক, বড় বাড়ি কিংবা বিলাসবহুল জীবন সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু অপরাধের জীবন প্রকৃত শান্তি দেয় না।
খুতবার শেষদিকে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবার, মসজিদ, স্কুল, শিক্ষক, ইমাম এবং গোটা কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের সময়, ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে, যাতে ভুল মানুষ তাদের জীবনে জায়গা করে নিতে না পারে।
শায়খ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন