রাষ্ট্রদূত কার, রাষ্ট্রের না সরকারের? বাংলাদেশের কূটনীতিতে আনুগত্যের সীমারেখা টানার সময়

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড ||

একটি সরকার ক্ষমতায় আসে, দেশ পরিচালনা করে, একদিন ক্ষমতা থেকে চলে যায়। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়। পতাকা থেকে যায়। সংবিধান থেকে যায়। জাতীয় স্বার্থও থেকে যায়। তাহলে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা বহনকারী একজন রাষ্ট্রদূত আসলে কার প্রতিনিধি, রাষ্ট্রের না ক্ষমতাসীন সরকারের?

প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ। কিন্তু এর উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসেবার পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একজন রাষ্ট্রদূত অবশ্যই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করেন। নির্বাচিত সরকার যে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেটি তুলে ধরা এবং বাস্তবায়নে কাজ করা তার দায়িত্ব। কিন্তু সরকারের নীতি বাস্তবায়ন আর সরকারের রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হওয়া এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটিই পেশাদার কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা।

বাংলাদেশের গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পররাষ্ট্রসেবাতেও রাষ্ট্র, সরকার এবং দলের মধ্যকার সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে লন্ডন, অটোয়া, ওয়াশিংটন, জেনেভা, প্যারিস এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ, রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যমে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। কোথাও মানবাধিকার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও প্রবাসী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে দূতাবাসের সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ এসেছে। কোথাও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কিংবা বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক ভাষ্যের মধ্যকার পার্থক্য কতটা বজায় রাখা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। সরকারের নীতি ব্যাখ্যা করা কোনো কূটনীতিকের রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রমাণ নয়। সেটি তার দায়িত্বেরই অংশ। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন রাষ্ট্রের অবস্থান ব্যাখ্যা এবং একটি রাজনৈতিক দলের বয়ান প্রচারের মধ্যকার সীমারেখা মুছে যায়। তখন রাষ্ট্রদূত আর শুধু রাষ্ট্রের পেশাদার প্রতিনিধি হিসেবে দৃশ্যমান থাকেন না, তাকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিনিধি হিসেবেও দেখা শুরু হয়। এখানেই বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য বিপদ।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম দীর্ঘ সময় লন্ডনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে হাইকমিশন সক্রিয় ছিল। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ব্রিটিশ বাংলাদেশি সমাজের একটি অংশ থেকে হাইকমিশনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ মানেই প্রমাণ নয়। কিন্তু একজন রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে কেন এমন ধারণা তৈরি হলো, সেটিও একটি পেশাদার পররাষ্ট্রসেবার বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত।

কানাডায় বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার ড. খলিলুর রহমানও দীর্ঘদিনের একজন ক্যারিয়ার কূটনীতিক। তার সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং যোগাযোগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজে মিশনের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মত ও সমালোচনা ছিল। একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক অবশ্যই একজন নাগরিক এবং তার মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর প্রকাশ্য রাজনৈতিক মন্তব্য করলে তার বক্তব্য সাধারণ নাগরিকের বক্তব্যের মতো বিবেচিত হয় না। তার সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রীয় পরিচয়টিও জড়িয়ে থাকে। ফলে সাবেক কূটনীতিকদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পেশাগত উত্তরাধিকারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা অস্বাভাবিক নয়।

নাহিদা সোবহান বাংলাদেশের আরেকজন অভিজ্ঞ ক্যারিয়ার কূটনীতিক। রোম, কলকাতা ও জেনেভায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি জর্ডানে রাষ্ট্রদূত এবং কানাডায় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মানবাধিকার, রোহিঙ্গা সংকট, শরণার্থী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শ্রম, স্বাস্থ্য এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে তাকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক রদবদলে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে ভবিষ্যৎ কূটনীতিকদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার এই সিদ্ধান্তও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন নিয়ে আসে, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কূটনীতিকদের কী ধরনের পেশাগত সংস্কৃতি শেখাতে চাই?

রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলামও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ক্যারিয়ার কূটনীতিক। তার কর্মজীবনে বহুপাক্ষিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম এবং উন্নয়ন কূটনীতির অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু সাইদা মুনা তাসনিম, ড. খলিলুর রহমান, নাহিদা সোবহান বা মো. নজরুল ইসলাম এই লেখার মূল বিষয় নন। ব্যক্তির চেয়ে প্রশ্নটি অনেক বড়। বাংলাদেশ কি ব্যক্তিনির্ভর ও সরকারনির্ভর কূটনীতি চায়, নাকি রাষ্ট্রনির্ভর পেশাদার পররাষ্ট্রসেবা চায়?

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা হলো সরকার পরিবর্তনের পর কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার প্রবণতা। কে আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, কে নতুন সরকারের কাছাকাছি, কে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল, এসব প্রশ্ন অনেক সময় একজন কর্মকর্তার পেশাগত দক্ষতা, সততা ও কর্মসম্পাদনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি পররাষ্ট্রসেবার জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কারণ আজ যদি একজন কূটনীতিক মনে করেন তার ক্যারিয়ারের সাফল্য নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি দৃশ্যমান আনুগত্যের ওপর, তাহলে আগামীকাল সরকার পরিবর্তিত হলে তিনিই রাজনৈতিক সন্দেহের শিকার হবেন। এটি একটি দুষ্টচক্র। এই চক্র ভাঙতে হলে রাজনৈতিক আনুগত্যের জায়গায় পেশাগত আনুগত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

কোনো কূটনীতিকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলেই সেটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে যায় না। আবার রাষ্ট্রীয় পদে থাকার কারণে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলাও বন্ধ হতে পারে না। দলীয় পক্ষপাত, আর্থিক অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তার বিচার হতে হবে তথ্য, নথি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় তখনই, যখন একই মানদণ্ড রাজনৈতিক বন্ধু ও প্রতিপক্ষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।

বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দূতাবাস বা হাইকমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের বিদেশি কার্যালয় নয়। এটি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাগরিকের রাষ্ট্রীয় ঠিকানা। সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক কিংবা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক নাগরিক, সবার সমান মর্যাদা পাওয়ার কথা। পাসপোর্ট নবায়ন, কনস্যুলার সহায়তা, আইনি সংকট, শ্রমিকের অধিকার, গ্রেপ্তার, দুর্ঘটনা, মৃত্যু কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে একজন বাংলাদেশিকে যেন কখনো ভাবতে না হয়, তিনি কোন দলের সমর্থক। দূতাবাসের দরজায় তার একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক।

কোনো মিশন সম্পর্কে যদি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে সেটি একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, তাহলে ক্ষতি শুধু সেই রাষ্ট্রদূতের হয় না। ক্ষতি হয় বাংলাদেশের। কারণ কূটনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ভবন, গাড়ি, প্রটোকল কিংবা পদমর্যাদা নয়। কূটনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ বিশ্বাসযোগ্যতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা আরও কঠিন হয়েছে। একজন রাষ্ট্রদূত বা জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের ব্যক্তিগত ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থাকতেই পারে। কিন্তু উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সীমারেখা সাধারণ নাগরিকের মতো নয়। একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য, একটি শেয়ার, এমনকি একটি লাইকও রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা হতে পারে। তাই কর্মরত কূটনীতিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে দলীয় প্রচারণা, রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক বন্দনা কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান থেকে পেশাগত দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আচরণবিধি থাকা উচিত। উদ্দেশ্য কারও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়। উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামতের সীমারেখা পরিষ্কার রাখা।

আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বদলালে কি রাষ্ট্রদূতও বদলাতে হবে? প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম শক্তি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা। সরকার পরিবর্তিত হবে। পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ক্যারিয়ার কূটনীতিক রাষ্ট্রের পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে থেকে যাবেন। নতুন সরকার এলে তিনি সেই সরকারের বৈধ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করবেন।

কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি পুরো পররাষ্ট্রসেবাকে নতুন করে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় বসানো হয়, তাহলে কোনো পেশাদার কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না। একজন দক্ষ কূটনীতিক তৈরি করতে রাষ্ট্রের বহু বছর লাগে। ভাষা, আন্তর্জাতিক আইন, বাণিজ্য আলোচনা, নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি, বহুপাক্ষিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা রাতারাতি অর্জিত হয় না। সুতরাং প্রয়োজন রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, পেশাগত জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসেবায় এখন কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্রদূত নিয়োগ ও পদায়নে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ভাষাজ্ঞান, সংশ্লিষ্ট অঞ্চল সম্পর্কে ধারণা এবং কর্মজীবনের রেকর্ডকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য স্বচ্ছ এবং পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। প্রবাসী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে মিশনের যোগাযোগের পরিষ্কার নীতিমালা থাকতে হবে। দূতাবাস সবার সঙ্গে কথা বলবে, কিন্তু কারও রাজনৈতিক অংশীদার হবে না।

কর্মরত কূটনীতিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্যও সুস্পষ্ট পেশাগত আচরণবিধি প্রয়োজন। কোনো কূটনীতিকের বিরুদ্ধে দলীয় পক্ষপাত, আর্থিক অনিয়ম বা স্বার্থের সংঘাতের গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত হতে হবে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। সরকারকে বুঝতে হবে, একজন ভালো কূটনীতিক মানেই একজন রাজনৈতিকভাবে অনুগত কর্মকর্তা নন। বরং একজন দক্ষ কূটনীতিক কখনো কখনো এমন কথাই বলবেন, যা রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুনতে চাইবে না। বিদেশি সরকারের মনোভাব, আন্তর্জাতিক জনমত, মানবাধিকার পরিস্থিতি কিংবা কোনো নীতির সম্ভাব্য কূটনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু সেটিই তার দায়িত্ব।

যে পররাষ্ট্রসেবা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শুধু সেই কথাই শোনায় যা নেতৃত্ব শুনতে চায়, সেটি রাষ্ট্রকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে না। বরং কখনো কখনো বিপজ্জনক আত্মতুষ্টি তৈরি করে।

বাংলাদেশ এখন এলডিসি উত্তরণ, রপ্তানি বাজার, বিদেশি বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট, মানবাধিকার, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতির মতো জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। এমন সময়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং পেশাদার পররাষ্ট্রসেবা।

সাইদা মুনা তাসনিম, কানাডার সাবেক হাইকমিশনার ড. খলিলুর রহমান, নাহিদা সোবহান, মো. নজরুল ইসলাম কিংবা অন্য কোনো কূটনীতিককে ঘিরে বিতর্ক তাই শুধু ব্যক্তিগত বিতর্ক হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে।

আসল প্রশ্নটি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান।

আমরা কেমন পররাষ্ট্রসেবা চাই?

এমন একটি পররাষ্ট্রসেবা, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রদূতদের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হবে? নাকি এমন একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যেখানে একজন রাষ্ট্রদূত জানবেন, তিনি বর্তমান সরকারের বৈধ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকই, কিন্তু তার চূড়ান্ত পেশাগত দায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি?

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতির জন্য দ্বিতীয় পথটিই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কারণ সরকার আসে, সরকার যায়। ক্ষমতার চেয়ার বদলায়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলায়। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়।

আর তাই বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত কোনো সরকারের লোক হিসেবে নয়, কোনো দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নয়, কোনো নেতার অনুগত কর্মকর্তা হিসেবেও নয়।

তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত, তিনি বাংলাদেশের কূটনীতিক।

সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করবেন তিনি, কিন্তু রাষ্ট্রকে কোনো দলের সম্পত্তিতে পরিণত হতে দেবেন না। এই সীমারেখা যতদিন স্পষ্ট না হবে, বাংলাদেশের কূটনীতিতে সরকার বদলাবে, রাষ্ট্রদূত বদলাবে, বিতর্কও বদলাবে, কিন্তু মৌলিক সংকটটি থেকেই যাবে।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন