সংবাদকর্মীরা সমাজের দর্পণ' সত‍্য উন্মোচন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সায়েম ||

সংবাদকর্মীরা সমাজের দর্পণ। সমাজের নানা অসঙ্গতি, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ, মানুষের না বলা কথাগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরাই তাদের অন‍্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি দায়িত্বশীল ও স্বাধীন গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না, বরং ঘটনার অন্তরালে থাকা সত্য অনুসন্ধান করে এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমতাবানদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করে।

একটি ঘটনা যখন জনসমক্ষে আসে, তখন তার দৃশ‍্যমান অংশের পাশাপাশি অদৃশ্য কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব‍্যক্তিদের ভূমিকা খুঁজে বের করাও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কে ঘটনার সঙ্গে জড়িত, কিভাবে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর কি প্রভাব পড়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজন। 

বিশেষ করে দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব‍্যবহার কিংবা বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা সরাসরি কথা বলতে পারেন না, প্রভাবশালী মহলের ভয়ে অভিযোগ সামনে আনতে পারেন না। তখন সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী ভূমিকা সমাজের সামনে সত্য তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। তবে সত্য উন্মোচনের এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার সততা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য নয়। অভিযোগর সত‍্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, নির্ভরযোগ‍্য তথ‍্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি ও নৈতিক সীমারেখা মেনে সংবাদ প্রকাশ করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয়।

একজন সংবাদকর্মীর কলম কিংবা ক‍্যামেরা যেমন অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রকাশিত কোনো তথ্য একজন নির্দোষ মানুষের জন্য ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে 'সত্য' যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্যের যথার্থতা, ভারসাম্য ও প্রেক্ষাপট। 
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন‍্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাবান ব‍্যক্তিদের কর্মকান্ডের ওপর জনস্বার্থে নজরদারি করতে পারে। অন‍্যদিকে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ এবং তথ্য পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। 
আজকের ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের কারণে তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু দ্রুততা যেন সত‍্যতা যাচাইয়ের বিকল্প না হয়ে ওঠে, সেদিকেও সংবাদকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ একটি ভুল সংবাদ যেমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি প্রকৃত অপরাধের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। 
সাংবাদিকতার মূল শক্তি মানুষের আস্হা, সেই আস্হা ধরে রাখতে সংবাদকর্মীদের সত‍্যের অনুসন্ধান, জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পেশাগত সততা বজায় রাখতে হবে, একই সাথে অপরাধের সাথে জড়িতদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরার ক্ষেত্রে আবেগ নয়, তথ্য-প্রমানকেই প্রাধান্য দিতে হবে।
একটি সত‍্যনিষ্ঠ সংবাদ কখনো কখনো সমাজে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রক্ষা করতে পারে একজন ভুক্তভোগীর অধিকার, কিংবা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে ব‍্যবস্হা নিতে বাধ্য করতে পারে।

তাই সংবাদকর্মীরা শুধু খবরের বাহক নন, তারা সমাজের চোখ, কান এবং অনেক ক্ষেত্রে বিবেকের ভূমিকা পালন করেন। সত‍্যকে সামনে আনা, অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা এবং জনস্বার্থে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাই হোক সাংবাদিকতার মূল অঙ্গীকার। কারণ সংবাদকর্মীর দায়িত্ব কাউকে অপরাধী বানানো নয়, বরং তথ‍্য-প্রমাণের  ভিত্তিতে সত‍্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরা। আর সেই সত‍্যই পারে সমাজের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন