আজকে তিন পেরিয়ে চারে তোমার পা। এইতো সেদিন, অথচ ক্যালেন্ডারের পাতায় অনেকদিন। আনন্দের বন্যায় ভাসতে ভাসতে কবে যে মানসস্মৃতিপটে লেখা হয়ে গেছে হাজার ছিয়ানব্বই দিনের ডায়েরি তা যেন টেরই পেলাম না। খুনসুটি আর দুষ্টামিতে, বুকে কিংবা দূরত্বে, কানে এবং ফোনে আমাদের যে গল্প জমেছে, আড্ডা হয়েছে তা আজন্মের তরে রঙিন সুতোয় বাঁধা। সুখের সময়, আনন্দের সময় বেরসিক বরফের মতো গলে যায়, বাতাসের মতো বয়ে যায়। কী হয় আরেকটু ধীরে গেলে? এই-তো সেদিন নায়েমের ট্রেনিং-এ ছিলাম, তোমার মায়ের কাছে খবর পেলাম- দুনিয়ায় আসতে তুমি ব্যস্ত হয়ে উঠছো অথচ চোখের পলকেই তিনটে বছর ফুরুৎ করে ফুরিয়ে গেল। ’২৩-এর ২০ আগস্টের রাত্রির প্রথম প্রহরে তোমার-আমার চোখাচোখিতে যে ভাবের আদান-প্রদান হয়েছিল সেসবই এখন ভাষায় প্রকাশ পায়। কী কথা হয়েছিল আমাদের? আমার আনন্দাশ্রুর অর্থ কী ছিল? কী ছিল তোমার চোখের বিস্ময়ের মানে? সেদিনের অর্থহীন শব্দও জীবনের পরমার্থ হয়ে প্রতিভাত হয়েছে। সে অনন্য, সে বিস্ময়!
শোন আত্মজা,
তোমার প্রথম কান্না, প্রথম হাসি, ঘুমানো কিংবা ঘুম থেকে জেগে ওঠা, হাই তোলা— সারাক্ষণ অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করতাম। ভাবতাম, এই ছোট্ট দেহটার মধ্যেই একটা প্রাণ আর সে প্রাণটাই আমার জীবন। আমার সবকিছুর প্রেরণা হয়ে হৃদয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছ। যখন দূরে থাকি তখনও যেন আমার গোটাটা জুড়েই কেবল তুমি— ভাবনায়, চিন্তায়-চেতনায়। যেন কেউ মন্ত্র পাঠ করে আমাকে মুগ্ধ করছে। আমার মনের মধ্যে তোমার বাস স্থায়ী করছে। কী অপার বিস্ময়! আমাদের অপূর্ণতার মাঝে তুমি নিয়ে এলে পরম পূর্ণতা। আমাদের সংসারের সব অপ্রাপ্তি ঘুচে গেছে তোমার আগমনে। জীবনে যে আনন্দ এসেছে, যে সুখ হেসেছে, যে সুর গেয়েছে তার কেন্দ্রজুড়ে তুমি। যেন তুমি আমার বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু আর আমি সেটার পরিধি। তোমার জন্মদিনে পৃথিবীর সব রঙ, সব হাসি, সব খুশি যেন তোমাকে ঘিরে থাকে- শুধু আজ নয়, আগামী। শুভ শুভ জন্মদিন আমাদের সোনা মামনি। মঙ্গলালোকের নিরন্তর যাত্রা তোমাকেও করুক শুভের সারথি।
আমাদের সোনা মা,
তোমার দুষ্টুমিতে, হাসি ও আনন্দে আমাদের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তোমার মাঝে, তোমায় দেখে আমরা নতুন করে বাঁচার রসদ খুঁজে পাই। তোমার উপস্থিতিতে ঘর ভরে ওঠে সোনার আলোয়। তোমার কথায় খিলখিলিয়ে ওঠে জানালার পর্দা, দোল খায় দরজা। মনের দেয়ালের সবটুকুতে যেন তোমার আল্পনা। তুমি পাশে না থাকলে মনে হয় যেন চারদিকে চরম শূন্যতা ধেয়ে আসছে। আমাদের যত পরিকল্পনা, শ্রম-ঘাম সব তোমার আগামীর জন্য সঞ্চয়। আমাদের কাছে তোমার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তোমার থেকে মূল্যবান আর কিছুই নাই। তোমার কল্যাণ প্রার্থনায়, তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা আমাদের জীবন উৎসর্গ করতে শপথ নিয়েছি। জীবনের পথে এগিয়ে দিতে, আজন্ম পাহারা দিতে সদা প্রস্তুত আছি। আমরা এখন ভাসমান নৌকা— তুমি যে পথে নেবে, যে ঘাটে বাঁধবে, যেভাবে বলবে সেটা আমাদের কবুলকৃত আগামী। আমরা চাই, আমাদের সন্তান দুধে-ভাতে থাকুক। হাসি-আনন্দে বাঁচুক। আমাদের আয়ু থেকে তোমাকে ততটাই দিয়ে দেবো যতটা পেলে তুমি শতায়ু হবে। আমাদের সুস্থতাও তোমাকে দিয়ে তোমাকে চিরকাল সুস্থ দেখতে চাই— এইতো আমাদের চাওয়া। আমাদের যা পাওয়ার তা পেয়ে গেছি- এবং সেটা তুমি; এবার আমাদের তোমায় দেওয়ার পালা। আমাদের সব, আমাদের আজ, কাল এবং সম্পূর্ণ আগামী কেবলি তোমারি।
আদরের তনয়া,
মা, মা এবং মা— তাকে সম্মান দিও। তোমার জীবনের আজকের দিন পর্যন্ত যদি বাবা-মায়ের অবদান মূল্যায়ণ করি তবে তোমার মা তাতে শতকরা ৯৫ নম্বর পাবে। বাকি পাঁচ হয়তো আমার ভাগে থাকবে। তোমাকে পৃথিবীর রূপ-রং দেখানোর জন্য যে নারী হাসি মুখে মৃত্যুর দুয়ারে বীরদর্পে প্রবেশ করেছে সে মহান না হয়ে পারে না। একজন নারী তার জীবনের সব শখ-আহ্লাদ ভুলে কেবল সন্তানকে আগলে রাখার যে ভূমিকা পালন করেন সেটার জীবন্ত দৃষ্টান্ত তোমার জননী। কত রাত জেগে, কত শত কষ্ট সয়ে তোমার যত্ন নিচ্ছে, তোমার আগলে রাখছে তা দেখে-ভেবে অবাক হই। মায়েদের কী ক্লান্তি গ্রাস করতে পারে না? তোমাকে খাওয়ানো খুব সহজ কাজ নয়। তুমি কখনোই যেন কিছুই খেতে চাও না। খাওয়া নিয়ে সব সময় জোর করতে হয়। কী অপার ধৈর্যের সাথে, কত মমতায় মা তোমাকে খাওয়ানোর অবিরাম চেষ্টা করে, গোসল করায়, ঘুমিয়ে দেয় কিংবা কোলে-কাঁধে ব্যাগের মতো বয়ে বেড়ায়— তা স্মৃতি করে রাখলে, বোঝার বয়সে তা দেখে তুমিও বিস্মিত হতে। মা বলেই কেবল সে সেটা পারে। সেই মাকে কখনোই কষ্ট দিও না, অমর্যাদা করো না। মায়ের সব কথা শুনবে। মায়ের লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবে। মায়ের আদরের চাদর মেখে বেড়ে উঠবে- প্রত্যাশা রইলো।
হৃদয়ের নন্দিনী
তোমার বাবা হিসেবে আমার যত দায়িত্ব সে-সবের অনেকটাই অনাদায়ী রয়ে গেছে। তোমার প্রতি পালনীয় কর্তব্যের কতকিছু যে অপূর্ণ আছে তা ভাবলে বুকের বামপাশে ব্যথা অনুভব করি। মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবন বাস্তবতার এই ব্যস্ততায় অধিকার হরণের যে অপরাধ ঘটছে তাতে আমার বিচারক আমি হলেও নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি দিতাম। বিবেক আমায় এ ব্যাপারে নিত্য প্রশ্ন করে। তবে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ রেখে, মান অভিমান বুকে পুষে, হাসি-উচ্ছ্বাসে ছন্দপতন ঘটিয়ে তুমি আমায় কখনো শাস্তি দিও না। তোমার মুখের হাসিতে আমার হৃদয়ের স্পন্দন গতিশীল থাকে। কোনো ঝড়ের কবলে পড়লেও তা কখনোই থামতে দিও না। তবে দৃঢ় বিশ্বাস আছে, আমার প্রতি কর্তব্য পালনে যদি কখনও ব্যর্থ হই, ভুলে যাই দায়িত্ব তবুও আমার স্রষ্টা তোমায় দেখে রাখবেন, সুখী করবেন। কখনো তাকে ভুলে যেও না— মনে রেখো, তিনি তোমারও রব। তিনিই তোমাকে ভয়মুক্ত এবং নিরাপদ রাখবেন। তোমার বাবার কিছু বন্ধু-সুহৃদ আছে যারা তোমাকে তোমার বাবার অনুপস্থিতেও তোমার বাবার মতোই স্নেহ-আদর দেবে, খেয়াল রাখবে। কাজেই ভয় নেই মা। তোমার বাবারাই তোমার জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবীর সূচনা করতে আমরণ চেষ্টা করে যাবে। আমাদের বাপ-বেটির মায়া বাড়তে বাড়তে একটা মায়াময় পৃথিবীর সৃষ্টি হোক— সেই কামনায় আজ এবং নিরন্তর আগামী।
ইতিতে,
বড় মা রাইসা আহমেদের ছোট্ট বাবা রাজু আহমেদ।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন