রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
মুখের ভাষা খারাপের চেয়ে মানুষের সৌন্দর্যহীনতার দ্বিতীয় ব্যাপারগুলো দূরতম। কখনো কখনো নিষ্ঠুরতার চেয়ে ভাষার অপপ্রয়োগ আরও কদর্যতর। অশ্লীল সম্মোধন, তুই-তুকারিতে অপমান কিংবা তাচ্ছিল্যের ভাষায় বাঁচা প্রায় অসম্ভব। যে তিনবেলার খাবার জোটাতে পারে না সেও অন্যের থেকে সম্মান আশা করে। অথচ অনেকেই অন্যদের হেয় করে আনন্দ পায়। জিহ্বায় অশ্লীলতা, অশ্রাব্যতার চেইন ঝুলিয়ে রাখে। খোঁচা দিয়ে কথা বলে নিজের বড়ত্ব জাহির করে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে। অরুচিকর ভাষা, বিনিময়ের খোঁটা কিংবা কথার কাঁটা দিয়ে হুল ফুটানো মানুষগুলো ভীমরুলের চেয়েও বিষাক্ত। মৌমাছির হুল মধুর বিনিময়ে তবুও তা সহ্য হয় না। অথচ মানুষ মধু না দিয়েই কথায় কথায় কলিজায় তীর বিঁধিয়ে তছনছ করে দেয়।
আত্মসম্মান জীবনের আঙিনায় একটা দামী এবং দরকারি ব্যাপার। কেউ সম্মান না দিলে, কোথাও মূল্যায়ন না পেলে সেখানে থামা উচিত না। যারা কথা রাখবে না, মতামত শুনবে না তাদের সামনে কিছু বলা শব্দ ও সময়ের অপচয়। কারো ভুলে তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া যায়, দরকারে বকা যায় কিন্তু বকা যদি গালাগাল হয় তবে সেটার দায় আজীবন কিস্তিতে শোধ করতে হবে। শব্দের দাগ যদি একবার মনকে পোড়ায় তবে তা সহজে ভুলতে পারে এমন মানুষ কম। মানুষ যাদের আপন হয় কিংবা মানুষ যাদের থেকে দূরে যায় তা কিন্তু শব্দের স্রোতে নির্ভর করে। ব্যবহারের আগে বাক্যের ঘষামাজা যারা করতে পারে না তারা মানুষের মন পর্যন্ত শব্দের অনুরণন পৌঁছাতে পারে না।
বধির না হলে সব শব্দই কান পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু স্বস্তি পেতে, ভরসা গড়তে এবং বিশ্বাস জমতে হৃদয়স্পর্শী শব্দের দরকার পরে। এইরূপ শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করে তা সবাই উচ্চারণ করতে পারে না। যারা পারে তারা হয়ে ওঠে অন্যরকম মানুষ। যে মানুষের মর্যাদা থাকে, আলাদা সম্মান পায় এবং তাদের নামে শ্রদ্ধার পুষ্পকরথ ঝরে। ডানে বায়ে কত বস অথচ কেউ কেউ হৃদয় জয় করে ফেলে। অনিচ্ছাতেও অশ্লীলতা জিহ্বায় ভর করতে দেওয়া অন্যায়। যে একবার অশ্রাব্য শব্দের বন্যায় ভেসেছে সে আসলে হারিয়ে ফেলেছে তার ব্যক্তিত্বকে। যার ব্যক্তিত্ব নাই তার আর এমন কিছুই নাই যা অন্যকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে।
জীবনে যার সাথে মাত্র একবারের জন্যেও দেখা হবে সেও আসলে ঐ একটিবারেও সম্মান চায়। সম্বোধনে তার প্রাপ্য চায়। যারা সাথে দেখা হবে বারবার সেও একবারের জন্যেও তার প্রাপ্য হারাতে চায় না। অন্যকে মূল্যায়ন করলে সেটার ফলাফল কী? নিজেরও মূল্যায়িত হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হয়। অন্যকে সম্মান না দিয়ে সম্মান পেয়েছে এমন ঘটনাই বিরল। তখন যা জুটে তা দেখা/বোঝার ঝুট। ভয় এবং সম্মান, অভিনয় এবং ভেতরের বাস্তবিক ব্যবহার মোটেও সমান সমান নয়। পদের ভারীত্ব, ক্ষমতার দৌরাত্ম্য অনেককেই নানান মেকি আনন্দ দেয়। আসলের খোঁজ মেলে ক্ষমতাহীনের দুয়ারে। অবসরের গল্প তখন ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
অন্যকে সম্মান দিতেই হবে। কথা বলতে হবে মাধুর্যে। অন্যকে খাটো করা মানে নিজের অপমানিত হওয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে রাখা। সাবধান, আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে, অন্যায়ের সামনে আত্মসমর্পণ করে স্বার্থ উদ্ধারের খেলায় জড়ানো উচিত নয়। একবার অবস্থান হারিয়ে ফেললে তা পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা মোটেও সহজ নয়। এতে একজীবনের সাধনাও লাগতে পারে। জিহ্বার তীরকে সর্বদাই নির্দিষ্ট খাপে রাখতে হবে। একবার একটি বেফাঁস মন্তব্য মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলেও তা আর স্বাভাবিক পরিস্থিতি রাখে না। কাজেই কর্মের থেকেও কথায় সাবধানতা জরুরি। শব্দের গঠনের দক্ষ কারিগর না হলে যে শব্দের জন্ম হবে তা মানুষকে মানুষের মন থেকে দূরে ঠেলে দেবে। নড়বড়ে করে তুলবে পারস্পরিক সম্পর্ককে। কাজেই শব্দের প্রয়োগে সচেতনতা জরুরি।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন