"রাজনীতির মারপ্যাঁচ ও মানবিকতার পরাজয়: স্মৃতির কারাগারে আজীবন বন্দী সাদ্দামের করুন আর্তনাদ"

gbn

মানিক লাল ঘোষ //

​রাজনীতিতে ক্ষমতার দাপট, পদ-পদবি আর অসংখ্য অনুসারী থাকে। কিন্তু দিনশেষে মানুষ যখন একা হয়, তখন তার সব পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে তার অস্তিত্ব ও পরিবার। বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি—যা আমাদের সময়ের এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
​পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম দৃশ্য বোধহয় এটিই—যেখানে একজন বাবা ও স্বামী তার স্ত্রী-সন্তানের শেষ বিদায়টুকু জানাতে পারেন না। ২৩ জানুয়ারি দুপুরে বাগেরহাটের সদর উপজেলার সাবেকডাঙার বাড়িতে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্না স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশে পড়ে ছিল তাদের ৯ মাস বয়সী শিশুপুত্র সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ। পুলিশের ধারণা, চরম বিষণ্নতা থেকে সন্তানকে হত্যার পর স্বর্ণালী আত্মহত্যা করেছেন।
​২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর গ্রেপ্তার হওয়া সাদ্দাম তখন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। স্বজনদের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আকুতি জানানো হলেও আইন সেদিন ছিল পাথরের মতো শক্ত। ফলে ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় স্ত্রী ও সন্তানের নিথর দেহগুলো খাটিয়ায় করে নিয়ে আসা হয় জেলগেটে। কারাগারের লোহার শিকের ওপাশ থেকে সাদ্দাম মাত্র ৫ মিনিটের জন্য দেখলেন তার সাজানো সংসারের ধ্বংসাবশেষ। জেলগেটে মরদেহ দেখানোর এই অমানবিক দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
​অবশেষে স্ত্রী-সন্তানের দাফনের চার দিন পর ২৮ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান সাদ্দাম। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি সরাসরি ছুটে যান বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আড়ুয়াবরনি গ্রামে স্ত্রী ও সন্তানের কবরের পাশে। সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়ে সাদ্দাম যে আর্তনাদ করেন, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কবরের মাটি আঁকড়ে ধরে তিনি বিলাপ করে বলছিলেন:
​"বাবা, আমি তো ফিরে এসেছি, তুই কেন কথা বলছিস না? আমাকে কি একবার মাফ করা যায় না? আমি তো তোকে একবার কোলেও নিতে পারিনি বাপ। ও আল্লাহ, আমি কার কাছে যাবো? আমার ঘর তো এখন অন্ধকার! আমার স্ত্রী-সন্তানকে যারা আমার কাছে শেষবারের মতো আসতে দেয়নি, তাদের বিচার আমি তোমার কাছে দিলাম।"
​তিনি আরও বলেন, "আমি অপরাধী হলে আমাকে শাস্তি দিত, কিন্তু আমার নিষ্পাপ সন্তান আর স্ত্রীর কী দোষ ছিল? শেষবার একটু ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলাম, আল্লাহ আমাকে সেই সুযোগটুকুও দিল না। এখন এই মুক্তি দিয়ে আমি কী করব? আমার পুরো পৃথিবীই তো এই মাটির নিচে শুয়ে আছে।"
​প্রশ্ন জাগে—যে জামিন কয়েক দিন পর মিলল, তা কি মানবিক বিবেচনায় কয়েক দিন আগে হতে পারত না? যে সন্তান ও স্ত্রীর জন্য তিনি মুক্ত হতে চেয়েছিলেন, তারা যখন কবরে, তখন এই 'মুক্ত আকাশ' সাদ্দামের কাছে আজ অর্থহীন।
​সাদ্দাম আজ মুক্ত, কিন্তু তিনি সম্ভবত তার নিজের স্মৃতির কারাগারে আমৃত্যু বন্দী হয়ে গেলেন। আমাদের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো অনেক সময় কতটা যান্ত্রিক হতে পারে, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। রাজনীতি বা অপরাধ—আইন তার গতিতে চলুক, কিন্তু মানবিকতা যেন কখনো আইনের দোহাই দিয়ে জেলগেটে নিথর দেহ দেখার অপেক্ষা না করায়। সাদ্দামের এই মুক্তি আসলে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসের গল্প, যা ইতিহাসের পাতায় এক করুণ আর্তনাদ হয়ে থেকে যাবে।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন