ঘুমন্ত বিবেক, পাহারাদার সমাজ

gbn

কেবল যদি বিবেক সক্রিয় থাকত, তবে অনেক কিছু নিষ্ক্রিয় রাখলেই চলত। অথচ মানুষকে প্রায় সর্বত্রই পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। পরীক্ষার হল থেকে ব্যাংকের ভল্ট, মসজিদের জুতো থেকে মনের বারান্দা— মুহূর্তের জন্য চোখ ফিরিয়ে নিলেই অনেক কিছুই এদিক–সেদিক হয়ে যায়। সুযোগ পেলে আমরা যে কী সব করতে পারি, সেটার নজির বহুবার স্থাপন করেছি। 

 

নির্বাচনের হলফনামা, আয়কর রিটার্ন কিংবা মাপে কম— যেন ঠকাতেই ভালোবাসি। ট্রেনে বিনা টিকিটে যাত্রা, ভিক্ষাবৃত্তির নামে বিনা পুঁজিতে ব্যবসা কিংবা ধর্ম বেচে খাওয়ার লিপ্সা— অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে মানুষ রাখেনি। আমাদের বিবেক এতটা নিষ্ক্রিয় কেন?

 

আত্মমর্যাদাবোধে আমরা কেন পিছিয়ে থাকি?

 

জাপানে একবার একটি টোল প্লাজার সেন্সর প্রায় ৩০ ঘণ্টা বিকল ছিল। যানবাহন সে সময়টাতে টোল দিতে পারেনি। সেন্সর ঠিক হওয়ার পরই হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায়, স্বপ্রণোদিত হয়ে অনলাইনে বকেয়া টোল পরিশোধ করেছে। কোনো সিসি ক্যামেরার নজরদারি ছিল না, কেউ বাধ্যও করেনি। অথচ বিবেকের দায়বদ্ধতায় কেউ এক পয়সাও ফাঁকি দেয়নি। 

 

গোটা জাপানজুড়ে গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ-মাহফিল হয় না। যত্রতত্র মসজিদ-মন্দিরের দেখা নেই। ভোট এলে কেউ লেবাস পাল্টে জুব্বা-টুপি জড়ায় না। খাদ্যে ভেজাল নেই, ওজনে কম নেই। তাদের কেবল বিবেক আছে, আছে আত্মসম্মান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পচা রাজনীতির চর্চা নেই। সমাজে গুজব-হুজুগের আলাপ নেই। সবাই পালন করে যার যার দায়িত্ব। বিবেকের কী চমৎকার ব্যবহার সর্বত্র! অথচ আমাদের? 

 

ক্ষমতার অপব্যবহার করি, ধর্ম বিক্রি করি— তবু বিবেককে সক্রিয় করি না।

 

সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি করা আমাদের অভ্যাস। পেশায় থেকেও আমরা রাজনীতিবিদদের চেয়ে বড় রাজনীতিবিদ সাজতে চাই। অতীতে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা নৌকার পক্ষে প্রচারণা করেছে, বর্তমানে বিএনপির মনোনয়নের বৈধতায় পুলিশ হাততালি দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা কেউ ভাবি না। ভোটের জন্য জান্নাতের টিকিট বিক্রি করতেও ছাড়ি না। আসলে বিবেকহীন মাথা দিয়ে ভাবলে, হৃদয়হীন মুখ দিয়ে বললে যা হয়— আর কী! 

 

স্বার্থপরতার জন্য এমন কোনো হীন কাজ নেই, যা আমরা করতে পারি না। চরিত্র বদলাতে আমাদের জুরি মেলা ভার! নকল করে পাশ করতে পারি, চাকরি পেতে ঘুষ দিতে পারি কিংবা কাজ না করেও মাইনে নিতে পারি। যত যুক্তি, তা অবৈধকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই। জাতি জাতীয়ভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের জন্য দুর্বার আন্দোলন হয়; অথচ বোধ-বিবেকের জাতীয়করণের জন্য সামান্য আলোচনাও হয় না।

 

রাজনীতি ও ক্ষমতা নিয়ে এত মাতামাতি বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথায় পাওয়া যায়? এসএসসি কিংবা এইচএসসি রেজাল্ট বা জিপিএ–৫ নিয়ে এত হৈ-হুল্লোড় কোথায় শুনবেন? অথচ যারা পাশ করতে পারল না, ঝরে যাওয়ার শঙ্কায় পড়ল— তাদের কীভাবে জনসম্পদে পরিণত করা যায়, তা নিয়ে কারো কোনো আলাপ শোনা যায় না। 

 

সিন্ডিকেটের জিম্মি করার খবরে ক্রেতার রোজ ঘাম ছুটে যায় বাজারের ব্যাগ হাতে। অথচ বিবেক যদি সক্রিয় থাকত, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যদি সবাই ঐকমত্যে পৌঁছাত, তবে এই সমাজ-সংসার কত শান্তির হতো! দেশটা যে সত্যিই সোনার দেশ হতো—তা কি আমরা বুঝি না? সিজদার পরেই কারো ক্ষতি করার চিন্তা, নীতিভাষণ দেওয়ার পরেই লুটপাট—এগুলো বন্ধ করতে হবে। অন্ধ হয়ে থেকে দেশটার আর কত ক্ষতি করা হবে?

 

বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে, তবু বৃক্ষগুলো কুঠারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে না; কেননা বৃক্ষ মনে করে, কুঠারের হাতুড়িও তো বৃক্ষেরই স্বগোত্রীয়। আমাদের জাতীয় ক্ষতগুলোও ঠিক এভাবেই হচ্ছে। নিজ নিজ দায়িত্ববোধের প্রশ্নে নিজেকে প্রশ্ন না করার খেসারত দিতে হচ্ছে বারবার। বিবেক জাগানোর জন্য কোন টনিক কাজে আসবে, তা খোঁজা উচিত। যে জাতি ধর্মকেও চটুলভাবে স্বার্থ উদ্ধারে অপব্যবহার করতে দ্বিধা করে না, তাদের পচন সামান্য নয়। 

 

ঘুণ ধরা কাঠকে সজোর আঘাতেই সারাতে হয়। জাপানিদের থেকে আমাদের শেখার আছে। তবে জাতীয় ক্রিকেট দলের মতো যদি সব সফরে কেবল শিখতেই থাকি, তবে সারাজীবনেও কিছু অর্জন হবে না। যা শিখেছি, তা বাস্তবায়নের বোধ সৃষ্টি করতে হবে। সেজন্য ঘুমন্ত বিবেককে জাগাতেই হবে—যেন অন্যায়ের সংক্রমণ আর পচনের গন্ধ সমাজে বাড়তে না পারে।

 

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।  

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন