শরীর থাকে, মন সরে যায়। মানুষ থেকে মানুষের চলে যাওয়াটাই কেবল চোখে পড়ে। তবে শরীর গুটিয়ে নেওয়ার কত আগে যে মন উঠিয়ে নেওয়া হয়, তা সমাজের চোখে লাগে না। অনাদর, অবহেলা, অপমান আর অসম্মানে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের অনেক আগেই মনের বিচ্ছেদ কার্যকর হয়। বাধ্য হয়ে শরীর থেকে গেলেও মনটা থাকতে চায় না। মনকে তো বেঁধে রাখা যায় না। সমাজ, সন্তান কিংবা প্রথায় অভ্যস্ত হয়ে সংসার টিকে থাকে। কেননা বাবা-মায়ের সম্মান, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সমাজের চোখ রাঙানি—মনের বিরুদ্ধে গিয়েও অভিনয় করতে বাধ্য হতে হয়। কিন্তু যত্ন না পেলে মনটা কী থাকে? কী করে থাকবে? মনের সতেজ থাকা যে যত্নের ওপরই নির্ভর করে।
কেউ কেউ চরম প্রতিশোধ নিয়ে ভালোবাসার ঋণ শোধ করতে বাধ্য হয়। কেউ কোনো অভিযোগ না রেখে, কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিংবা কোনো অভিমান না পুষে নীরবে ছেড়ে যায়। কোনো নালিশ নেই, চিৎকার-চেঁচামেচির অনুপস্থিতিতে শব্দহীন প্রস্থানের আড়ালে চাপা পড়ে কত শব্দ। মুকুলেই বিনাশ হয় কত গল্প। অথচ একটু ভালোবাসা পেলে কী এমন ক্ষতি হতো? সব কি আদায় করা সম্ভব? কেউ কথা রাখে না, যত্ন করে না কিংবা অভিমান ভাঙায় না— কী করে এই অধিকার জাহির করা যায়? মানুষ কেন যে কেবল শরীরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়! অথচ ভালোভাবে বাঁচার জন্য মনের মধ্যে থাকতে হয়। যে মন পেল না, সে আসলে কিছুই পেল না।
সম্পর্কে অনেকেই কথার আঘাতকে সামান্য মনে করে। অথচ কারো কারো কোনো কোনো কথায় হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। মন থেকে যে একটা মানুষ উধাও হয়ে যায়, তাও তো কথার কারণেই। কাউকে অপমান করে কথা বললে, কাউকে তাচ্ছিল্যভরে উপহাস করলে— সে যতই আপন হোক, থাকে না। হয়তো নিরুপায় হয়ে শরীরের ওপর শরীরের ছায়া ফেলে, কিন্তু মনের দেখা মন কখনোই পায় না। মন খোঁজে শান্তি। সে শান্তি আসে যত্নের পথ গলিয়ে। বিশ্বাস যেখানে নেই, ভরসা যেথায় অনুপস্থিত—সেখানে ভোগ মাথাচাড়া দেয় বটে, কিন্তু উপভোগ দূরে দাঁড়িয়ে জীবনকে উপহাস করে।
অল্প অল্প গল্প দিয়েই জীবনকে সাজানো যায়। প্রিয়জনের প্রায়োরিটি সবার আগে রাখতে হয়। কেউ যদি কাউকে অজ্ঞাতেও ঠকায়, তবে ঠককেই বেশি ঠকতে হয়। মনের মধ্যে কী চলছে তা কেউ না দেখুক— একজন তো দেখেন। সেভাবেই তিনি সম্পর্কের মধ্যে দরদ দেন। কেউ যদি কাউকে সম্মানিত করে, তবে তার সম্মান আপনাআপনি বেড়ে যায়। শরীরের সুখ টাকা ও যন্ত্রে কেনা যায়, কিন্তু মনের সুখ মনের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। পরম যত্নে তা উন্মোচন করতে হয়। এখনো সম্মোহনী স্পর্শ লাগে। প্রলোভন দেখিয়ে আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থ উদ্ধার হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হয় না।
ভালোবেসে ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়ান। সঠিক মানুষটির সম্মানের জন্য দুনিয়া ভুলে যান। মনের মধ্যে জায়গা পেতে লড়াই করুন। শরীর হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, মন পেতে মন বাড়িয়ে রাখুন। দায়িত্ব-কর্তব্য এড়িয়ে যাবেন না। যেদিন শরীরের শক্তি থাকবে না, সাহায্য ছাড়া শরীর চলবে না—সেদিনও মনটা সক্রিয় থাকবে। মনের ওপর সওয়ার হয়ে আজীবন বাঁচা যায়। নিজেকে মনের খাঁচায় বন্দী করুন। কারো মনে কষ্ট দিলে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। যে মনের কোমলতা নষ্ট করে, ভ্রষ্টাচারে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবে—সে নিজের পায়ে নিজেই কুঠার মারে। কেউ একা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। জীবনে সম্পর্ক সম্পূর্ণ হলে জীবনও সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন