মেয়র হতে পারলে নিউইয়র্ক সিটি সরকারের রূপান্তরের অঙ্গীকার করেছিলেন জোহরান মামদানি। তবে তার এই অঙ্গীকার কতটুকু সফল করতে পারবেন তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর শঙ্কা।
৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সমাজতন্ত্রী দেশের সবচেয়ে বেশি আলোচিত রাজনৈতিক দায়িত্বগুলোর একটিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ইতিমধ্যেই তীব্র নজরদারির মুখে রয়েছেন। রিপাবলিকানরা তাকে উদারপন্থী এক ‘ভৌতিক চরিত্র’ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তারই কিছু ডেমোক্র্যাট সহকর্মী মনে করেন, তিনি অতিরিক্ত বামপন্থী। প্রগতিশীলরা খেয়াল রাখছেন, তিনি কোনোভাবে কেন্দ্রের দিকে সরে যাচ্ছেন কি না।
১ জানুয়ারি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই শহরের দায়িত্ব নেবেন। পুরো দেশ তাকিয়ে থাকবে, তিনি অফিসে পৌঁছে তার দেওয়া বড় প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেন কি না এবং একই সঙ্গে প্রতিদিনের দায়িত্ব সামলাতে পারেন কি না।
এদিকে সংশয়বাদীরা তার প্রতিটি ভুলত্রুটি চিহ্নিত করবেন।
নিউইয়র্কের অভিজ্ঞ ডেমোক্র্যাট রাজনৈতিক পরামর্শক জর্জ আর্টজ বলেন, শুরুর দিকটা শক্তভাবে তুলে ধরা মামদানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর্টজ সাবেক মেয়র এড কচের হয়ে কাজ করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিন তার ব্যবহার করতে হবে মানুষকে দেখানোর জন্য যে তিনি শাসন করতে পারেন।
মানুষের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি করতে হবে—“এই লোকটা কিন্তু সিরিয়াস।”’
আর্টজ বলেন, সেই প্রচেষ্টা শুরু হওয়া উচিত হবে মামদানির উদ্বোধনী দিনের ভাষণ দিয়ে, যেখানে নতুন মেয়রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে তার কর্মসূচির একটি সুস্পষ্ট নকশা তুলে ধরা এবং নিউইয়র্কবাসীকে জানানো—তিনি কী করতে চান এবং কিভাবে করতে চান।
তিনি বলেন, এরপর মামদানিকে নির্ভর করতে হবে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ওপর—যাদের তিনি নিয়োগ দিয়েছেন—যেন তারা দায়িত্বের বাস্তব দিকগুলো সামাল দেন, আর তিনি ও তার দল একসঙ্গে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাশ্রয়ী জীবিকা–নীতি চালিয়ে যেতে পারেন।
আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে প্রত্যাশা সামলানো
একটি বড় ধারণা নিয়ে মামদানি প্রচারণা চালিয়েছেন : ধনীদের বদলে কর্মজীবী নিউইয়র্কবাসীর সহায়তায় সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করা।
তার কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটির ভোটারদের উচ্ছ্বসিত করেছে এবং তাকে ডেমোক্রেটিক পার্টির এক নতুন নেতৃস্থানীয় মুখে পরিণত করেছে।
কিন্তু মামদানিকে হয়তো নিউইয়র্ক সিটি পরিচালনার নিরন্তর দায়িত্বগুলোর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—ময়লা যেন নিয়মিত পরিষ্কার হয়, গর্তভরা সড়ক মেরামত এবং সময়মতো তুষার পরিষ্কারের গাড়ি রাস্তায় নামানো। যখন সাবওয়েতে বিলম্ব হয় বা বন্যা, কোনো আলোচিত অপরাধ ঘটে বা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা সাইকেল লেনে গাড়ি পার্ক করেন—শহরের মেয়রের সমালোচনার মুখে পড়া অস্বাভাবিক নয়।
ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাসিল স্মাইকেল বলেন, ‘তার ছিল একটি আন্দোলননির্ভর প্রার্থিতা এবং সেটি সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ও জাতীয়—দুই জায়গায়ই প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয়।’
তিনি আরো বলেন, মামদানির জন্য ভালো হতে পারে—‘শুধু প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেওয়া এবং শুরুতেই দু-একটি ভালো সাফল্য অর্জন করা।’
স্মাইকেল বলেন, ‘এখানে ব্যস্ত রাখার মতো অনেক কিছু আছে।’
মামদানির কাজের বড় অংশ হবে যেসব নিউইয়র্কবাসী তার বিষয়ে সংশয়ী তাদের কাছে তার রাজনৈতিক দর্শন বিক্রি করা। স্মাইকেলের ভাষায়, ‘সবচেয়ে বড় বাধা’ হলো মানুষকে তার নীতিগুলো নিয়ে স্বচ্ছন্দ করা এবং বোঝানো—তিনি যা এগিয়ে দিচ্ছেন, তা শহরকে কীভাবে সহায়তা করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এসবের সবকিছু প্রথম দিনেই হওয়া কঠিন,’ ‘অথবা ৩০ দিনেও নয়, এমনকি ১০০ দিনেও নয়।’
চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
মামদানির সর্বজনীন বিনামূল্যে শিশু দেখভালের প্রস্তাব—সম্ভবত তার সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরিকল্পনাগুলোর একটি। যেটি নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। বাফেলোর এই মধ্যপন্থী নেতা মেয়র–নির্বাচিতকে সমর্থনও করেছেন।
হোকুল এই নীতিতে মামদানির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী এবং উভয় নেতা কর্মসূচিটিকে শীর্ষ অগ্রাধিকার মনে করেন। যদিও কিভাবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হতে পারে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আগামী বছর পুনর্নির্বাচনের মুখে থাকা এই গভর্নর বারবার বলেছেন, তিনি আয়ের ওপর কর বাড়াতে চান না—যে বিষয়টি ধনী নিউইয়র্কবাসীর জন্য মামদানি সমর্থন করেন—তবে তিনি করপোরেট কর বাড়াতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মামদানির মিত্র অঙ্গরাজ্যের সিনেটের উপনেতা মাইকেল জিয়ানারিস বলেন, ‘আমি মনে করি তার কর্মসূচির পক্ষে মিত্র ও সমর্থক আছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো গভর্নর কত দূর পর্যন্ত এগোবেন।’
তিনি বলেন, ‘এটা স্বীকার করা হচ্ছে যে ভোটাররা রায় দিয়েছেন এবং তার সফল প্রচারণার সঙ্গে খুব স্পষ্ট নীতিগুলো যুক্ত ছিল—তাই এগুলোতে অগ্রগতি না করা মানে হবে আমরা ভোটারদের মতামতকে অগ্রাহ্য করছি।’
শহরের প্রায় ১০ লাখ ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া স্থির রাখার মামদানির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অঙ্গরাজ্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে না।
কিন্তু এই প্রস্তাব ইতিমধ্যেই প্রতিকূলতার মুখে, কারণ বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শহরের ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত ইউনিটে বার্ষিক ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া স্থানীয় বোর্ডে বেশ কয়েকটি নিয়োগ দিয়েছেন।
এই পদক্ষেপ অন্তত প্রথম বছরে মেয়র–নির্বাচিতের জন্য পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন জটিল করতে পারে, যদিও মামদানি বলেছেন, তিনি ভাড়া স্থির রাখার সামর্থ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।
সামনে আরো চ্যালেঞ্জ
ইসরায়েল সরকারের সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার সমর্থনের কারণে শহরের ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি অংশের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো তিক্ত।
ইহুদি অধিকার সংগঠন অ্যান্টি–ডিফেমেশন লিগ ঘোষণা করেছে, তারা মামদানির নীতি ও নিয়োগ পর্যবেক্ষণ করবে এবং ‘নিউইয়র্ক সিটির পাঁচ বরোতে নজিরবিহীন ইহুদিবিদ্বেষের সময়ে ইহুদি বাসিন্দাদের সুরক্ষা’ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে।
এই মাসের শুরুতে এক দশকেরও বেশি আগে করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ইহুদি–বিরোধী ইঙ্গিত থাকার অভিযোগ উঠলে, মামদানির এক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি পদত্যাগ করেন। পোস্টগুলো প্রথমে অনলাইনে প্রকাশ করে এডিএল।
এরপর থেকে সংগঠনটি তার তৈরি করা বিভিন্ন কমিটিতে থাকা অন্যদের বিষয়ে আরো তথ্য প্রকাশ করেছে। জবাবে মামদানি বলেছেন, এডিএল প্রায়ই ‘ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসরায়েলি সরকারের সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য’ উপেক্ষা করে।
শহরের পুলিশ বিভাগে বরাদ্দ কমানোর তার অতীত আহ্বান এখনো একটি দুর্বলতা। দেশের সবচেয়ে বড় পুলিশ বাহিনীর শীর্ষে বড় ধরনের পরিবর্তনের শঙ্কা কমাতে, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশকে রাখার সিদ্ধান্ত কিছু উদ্বেগ প্রশমিত করেছে।
আরো রয়েছে ট্রাম্প ইস্যু
মাসব্যাপী উত্তেজনার পর আশ্চর্যজনকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ওভাল অফিস বৈঠকের মাধ্যমে ট্রাম্প ও মামদানির মধ্যে টানাপোড়েন আপাতত কিছুটা প্রশমিত হয়েছে—যদিও ভবিষ্যতে সংঘাত আবারও দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে অভিবাসন আইন প্রয়োগসহ নানা বিষয়ে তাদের তীব্র রাজনৈতিক মতভেদের কারণে এবং এমন যেকোনো ঘটনার জন্য, যা স্বভাবতই অনিশ্চিত এই প্রেসিডেন্টকে ক্ষুব্ধ করতে পারে।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন